অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৮ই রমযান, ১৪৪০ হিজরী

আন্তর্জাতিক নারী দিবস: ৯ জেলায় নারি ডিসি, প্রশাসনের উচ্চপদে ৫৩৫ নারী

Print

দৈনিক চিত্র প্রতিবেদক:
আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বিশ্বের অন্য দেশের মতো বাংলাদেশে ৮ মার্চ দিবসটি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে যথাযতভাবে পালনের জন্য নানা কর্মসূচী নেয়া হয়েছে। এবারে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সবাই মিলে ভাবো, নতুন কিছু করো নারী-পুরুষ সমতার নতুন বিশ্ব গড়ো’।

নারী-পুরুষের সমতার দিক দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় সবার উপরে রয়েছে বাংলাদেশের নাম। নারী শিক্ষায় এগিয়ে মেয়েরা। বর্তমানে প্রাথমিক স্কুলে মেয়েদের উপস্থিতি শতভাগ। ৯০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় রয়েছেন নারীরা। আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে পৃথিবীতে যেসব দেশে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সবচেয়ে বেশি হয়েছে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। নারীর উন্নয়ন ও অগ্রগতির এসব প্যারামিটার অনুযায়ী ‘বাংলাদেশের সময় এখন নারীদের।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন নারী উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে বাংলাদেশে বিশ্বের রোল মডেল।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী:

দিবসটি উপলক্ষে পৃথক প্রথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, বর্তমান সরকার নারী-পুরুষের সমতা বিধানে নারী শিক্ষার বিস্তারে, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীর ক্ষমতায়নসহ নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে। প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, সরকার এসডিজির লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর। দিবসটি উপলক্ষে বিশ্বের সব নারীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার বিগত ১০ বছরে নারীর ক্ষমতায়ন ও নারী উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন দেশ স্বাধীনের পর থেকে দেশে নারী উন্নয়নে নানা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এছাড়া নারীর প্রতি সহিংসতা দমনে দেশে ইতোমধ্যে বিভিন্ন আইন তৈরি করা হয়েছে। নারীর উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে নেয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পুনর্বাসন ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে ‘নারী পুনর্বাসন বোর্ড’ গঠন এবং জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রে নারীর সমানাধিকার বিষয়টি সংবিধানে নিশ্চিত করেন।

নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধের লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন-২০১০, ডিএনএ আইন-২০১৪, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭ ও যৌতুক নিরোধ আইন-২০১৮। ভিজিডি, বিধবাভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কর্মসূচী নেয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচী আওতায় মাতৃত্বকালীন ছুটি সবেতনে ৬ মাসে উন্নীত করা ছাড়াও বয়স্ক ভাতা, বিধবা-তালাকপ্রাপ্ত ও নির্যাতিত নারীদের ভাতা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধীদের ভাতাও দেশে চালু রয়েছে।

বাংলাদেশে নারীদের এই অগ্রযাত্রার কাহিনী এখন বৈশ্বিক গবেষণার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য প্রতিবেদনে নারী-পুরুষের সমতার দিক দিয়ে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে সবার ওপরে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী চারটি ক্ষেত্রে আবার বাংলাদেশ বিশ্বের সব দেশের ওপরে স্থান পেয়েছে। এই চারটি ক্ষেত্রের তিনটি হলো ছেলে ও মেয়েশিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি, মাধ্যমিকে ছেলে ও মেয়েদের সমতা এবং সরকার প্রধান হিসেবে কত সময় ধরে একজন নারী রয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন দেশে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দেশে দুটি দলের বিরোধ থাকলেও নারী উন্নয়নে এবং নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে দুটি সরকারের মধ্যে ব্যাপক ঐক্যমত ছিল। আর এ কারণে দেশে নারীদের অগ্রগতি জয়গান চলছে। তারা বলেন, দেশে নারী শিক্ষার প্রভাব সবক্ষেত্রে পড়েছে। অর্থনীতি, শ্রমবাজার, রাজনীতিসহ সবকিছুর মূলেই রয়েছে নারীর শিক্ষা।

এছাড়াও দেশে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের দিক থেকে নারীদের অগ্রগতি অনেক। এই সূচকে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন পৃথিবীতে যেসব দেশে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সবচেয়ে বেশি হয়েছে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। গত দশম সংসদে প্রধানমন্ত্রী সংসদ নেতা এবং উপনেতা এবং বিরোধীদলীয় নেতা এবং স্পীকার ছিলেন নারী। একাদশ সংসদেও প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা, উপনেতা ও স্পীকার নারী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন ’৯০ পর থেকে দেশে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা শুরু হয়। আর এর পুরোধায় ছিলেন নারী। ’৯০ পর থেকে পালাক্রমে নারীরাই দেশ শাসন করে আসছেন। যা বিশ্বে বিরল।

’৭১ সালে যুদ্ধের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা লাভ করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন পাকিস্তানের কাছ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করলেও স্বাধীনতা এই ৪৭ বছরের পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ অনেক ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন রয়েছে। এর মধ্যে নারী শিক্ষা এবং নারীর উন্নয়ন অগ্রগতি অত্যতম। দেশের শিক্ষা বিষয়ক পরিসংখ্যান ব্যুরোর ব্যানবেইসের হিসাব অনুযায়ী প্রাথমিক পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থীর ৫১ শতাংশ এখন মেয়ে শিশু। বর্তমানে মেয়েদের শতভাগই এখন স্কুলে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন মেয়েদের জন্য বিদ্যালয়ের যে পরিবেশ দরকার দেশে সেই ধরনের পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষকতায় ৬০ ভাগ শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে নারীদের। প্রাথমিক পর্যায়ে সবার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা থাকলেও মাধ্যমিক পর্যায়ে শুধু নারীদের বৃত্তির আওতায় আনা হয়েছে। এই বিষয়গুলো দেশের নারী উন্নয়নে কাজে দিয়েছে উল্লেখ করেন তারা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন দেশে নারীর ক্ষমতায়নের যাত্রা শুরু হয় স্বাধীনতার পর থেকে। এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেয়া হয়। জাতীয় সংসদে সর্বপ্রথম নারীদের জন্য ১৫টি আসন সংরক্ষিত করেন। এটাই বাংলাদেশের ইতিহাসে নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপ। যার ফলে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের প্রথম সংসদেই নারীরা প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পায়। বর্তমানে সংসদে সংরক্ষিত নারী প্রতিনিধির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০ এ। এছাড়া সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে সংসদ সদস্য হয়েছেন অনেকেই।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বর্তমান সরকার নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে কাজ করে যাচ্ছে। মন্ত্রণালয়গুলোতে জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট করা হচ্ছে। সব মন্ত্রণালয়ে নারী উন্নয়ন সংক্রান্ত ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার সমতা নির্ধারণে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ৪টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে নারীর সামর্থ্য উন্নীতকরণ, নারীর অর্থনৈতিক প্রাপ্তি বৃদ্ধিকরণ, নারীর মতপ্রকাশ ও মতপ্রকাশের মাধ্যম সম্প্রসারণ এবং নারীর উন্নয়নে একটি সক্রিয় পরিবেশ সৃষ্টিকরণ।

৯ জেলা সামলাচ্ছেন নারী ডিসি:

মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ হচ্ছে জেলা প্রশাসক (ডিসি)। ডিসি জেলার সর্বেসর্বা। দেশের ৬৪ জেলায় ৬৪ জন ডিসি রয়েছেন। সরকারের উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের জেলা প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়। বর্তমানে ৯ জেলায় নারী ডিসিরা দায়িত্ব পালন করছেন। তারা হলেন- সিরাজগঞ্জের ডিসি কামরুন নাহার সিদ্দীকা, নড়াইলের আনজুমান আরা, নরসিংদীর সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন, মুন্সিগঞ্জের সায়লা ফারজানা, ফরিদপুরের উম্মে সালমা তানজিয়া, পঞ্চগড়ের সাবিনা ইয়াসমিন, নীলফামারীর নাজিয়া শিরিন, কুড়িগ্রামের মোছা. সুলতানা পারভীন এবং শেরপুরের ডিসি আনার কলি মাহবুব।

মাঠ পর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নড়াইলের ডিসি আনজুমান আরা বলেন, ‘আমরা নারী বা পুরুষ হিসেবে নয়; একজন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছি। আমরা মাঠে কাজ করতে গিয়ে সেই ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়িওনি। কাজের ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতা আমি দেখি না। আমরা রাত ১২ পর্যন্তও কাজ করি। সমাজও আমাদের সহযোগিতা করে, আমরাও নিজেরা কমফোর্ট ফিল করছি। এখন আমাদের সমাজ অনেকটাই পাল্টে গেছে।’

কুড়িগ্রামের ডিসি মোছা. সুলতানা পারভীন বলেন, ‘আমি মনে করি কাজের ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের তুলনায় বেশি সিনসিয়ার। কারণ নারীদের চক্ষু লজ্জাটা কম্পারিটিভলি বেশি। কেউ যেন খোটা দিয়ে বলতে না পারে ছেলে হলে পারত মেয়ে দেখে পারে না, এই চিন্তাটা মাথায় রেখে সবসময় কাজ করার চেষ্টা করি।’

তিনি বলেন, ‘ভালো কাজ করলে মানুষের সমর্থন পাওয়া যায়। কাজের ক্ষেত্রে আমি তেমন প্রতিবন্ধকতা পাইনি বা বাধাপ্রাপ্ত হইনি। মানুষের কাছ থেকে হেল্পফুল অ্যাটিচিউডই পেয়েছি।’

‘আমি সময় গতানুগতিক চিন্তার বাইরে গিয়ে মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করছি। মানুষের সহযোগিতায় কাজগুলো সফলভাবে করতে পারছি। আমি এক বছর ধরে ডিসির দায়িত্ব পালন করছি। আমি মনে করি আমি সফল’ বলেন কুড়িগ্রামের ডিসি।

জেলা পর্যায়ে ডিসি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। ডিসি জেলার সাধারণ প্রশাসনিক কার্যক্রম, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং কালেক্টর হিসেবে ভূমি ব্যবস্থাপনা বিষয়গুলো দেখে থাকেন। এ ছাড়া নির্বাচিত সরকারের বিশেষ কর্মসূচি এবং চলমান সব উন্নয়নমূলক কাজে জেলা প্রশাসক তদারকি করে থাকেন।

সাধারণত নির্দিষ্ট সময় উপসচিব হিসেবে থাকার পর ফিটলিস্টভুক্ত এবং সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডে (এসএসবি) নির্বাচিত হওয়ার পর সরকারের উচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন সাপেক্ষে কাউকে জেলা প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়। জেলা প্রশাসক যেকোনো বিষয়ে যেকোনো মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, এমনকি প্রধানমন্ত্রীকে যেকোনো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় সরকারের নজরে আনার অনুরোধ বা অবগতি করতে পারেন।

প্রশাসনের উচ্চপদে ৫৩৫ নারী:

বর্তমানে প্রশাসনের উচ্চপদে ৫৩৫ জন নারী দায়িত্ব পালন করছেন। কোনো ক্যাডারের নয় সরকারের পদ হিসেবে বিবেচিত উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত পদগুলোতে এ নারী কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। নারী কর্মকর্তা ও সিভিল সার্ভিসের নারী কর্মকর্তাদের সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন, নীতি-নির্ধারণী হিসেবে বিবেচিত এসব পদে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে নারীরা ভালো অবস্থানে রয়েছেন। তবে নারীরা যে হারে চাকরিতে আসছেন সেই তুলনায় নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের সংখ্যা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই। এ জন্য দায়িত্বশীল পুরুষ সহকর্মীদের কাছ থেকে আরও নারীবান্ধব মানসিকতা আশা করছেন তারা।

বর্তমানে প্রশাসনে সিনিয়র সচিব, সচিব ও ভারপ্রাপ্ত সচিব রয়েছেন ৭৮ জন। এরমধ্যে নারী কর্মকর্তা রয়েছেন ৬ জন। নারীদের হার প্রায় ৮ শতাংশ। বৃহস্পতিবারের (৭ মার্চ) তথ্য অনুযায়ী, নারী অতিরিক্ত সচিব রয়েছেন ৮১ জন, মোট অতিরিক্ত সচিবের সংখ্যা ৫২৬ জন। ৭৩৮ জন যুগ্ম-সচিবের মধ্যে নারী রয়েছেন ৮৭ জন। প্রশাসনে নারী উপসচিব রয়েছেন ৩৬১ জন, বর্তমানে মোট উপসচিবের সংখ্যা এক হাজার ৮৪০ জন।

বিসিএস উইমেন নেটওয়ার্কের মহাসচিব ও জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালকের (সচিব পদমর্যাদার) পদ থেকে কয়েক মাস আগে অবসরোত্তর ছুটিতে যাওয়া নাসরিন আক্তার দৈনিক চিত্রকে বলেন, ‘বর্তমানে প্রশাসনে নারীদের অবস্থান আগের চেয়ে অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। নারীরা সংখ্যায় আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। মাঠ পর্যায়ে সব জায়গায় এখন আমাদের প্রতিনিধিত্ব আছে। এসিল্যান্ড থেকে শুরু করে ইউএনও, ডিসি- সব জায়গায়ই নারীরা রয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘তবে ডিসিশন মেকিংয়ের (নীতি-নির্ধারণী) যে পর্যায় রয়েছে আমরা যেটাকে ধরি যুগ্মসচিব এবং এর উপরের পদ অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পর্যায়ে নারীদের প্রতিনিধিত্ব ততটা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আসেনি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করছি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা আরও নারীবান্ধব হওয়া প্রয়োজন। নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিটা রাতারাতি পরিবর্তন হওয়ার নয়। এটা আস্তে আস্তে হবে। আমরা যদি আরকেটু নারীবান্ধব পরিস্থিতি বা পরিবেশ পাই তাহলে হয়তো আমাদের উত্তরণটা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে যাবে।’

মহাসচিব আরও বলেন, ‘তবে আমরা খুবই ভাগ্যবান যে শেখ হাসিনার মতো একজন নেতৃত্ব আমাদের সামনে আছে। উনার পক্ষ থেকে আমরা যেটা পাচ্ছি সেটাতে আমরা হ্যাপি। এরসঙ্গে আরও আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো আছে সেগুলো আরেকটু নারীবান্ধব হওয়া প্রয়োজন।’

বিসিএস উইমেন নেটওয়ার্কের উপদেষ্টা (সর্বশেষ সরকারি কর্মকমিশনের সচিব পদ থেকে পিআরএলে গেছেন) আকতারী মমতাজ দৈনিক চিত্রকে বলেন, ‘আপনি যদি মাঠ পর্যায়ে তাকান তবে দেখবেন বেশ ভালো, মেয়েরা দায়িত্বশীল বিভিন্ন পদে আসছেন, কাজ করছেন। কিন্তু উপরের দিকে হয়তো একটু সমস্যা আছে। তবে আগের তুলনায় বেটার।’

‘আমরা দেখেছি প্রধানমন্ত্রী কারও প্রতি যদি নজর দেন তবে হয়তো তিনি…কিন্তু নারীদের এগিয়ে দেয়ার মতো সে রকম কেউ নেই। নারীদের এগিয়ে দেয়ার পথ করে দিতে দায়িত্বে থাকা পুরুষ সহকর্মীরা সেভাবে দায়িত্ব নিতে পারেন না,’যোগ করেন আকতারী মমতাজ।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব আকতারী মমতাজ আরও বলেন, ‘আমরা সচিব পর্যন্ত গিয়েছি। আমাদের সেভাবে কেউ এগিয়ে দেয়নি, কেউ এগিয়ে দেয় না। তারপরও বলব প্রশাসনে নারীদের অবস্থানটা আগের চেয়ে সুদৃঢ় হয়েছে।’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে সর্বশেষ ২০১৭ সালের পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। সেই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে মোট নারীর সংখ্যা ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৮১৯ জন।

নারীদের মধ্যে প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কর্মরত রয়েছেন ৩০ হাজার ৪২ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৪০ হাজার ৫৬৩ জন। সবচেয়ে বেশি নারী রয়েছেন তৃতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে, এ স্তরে নারীর সংখ্যা ২ লাখ ৪৮ হাজার ৭৮০ জন। চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে নারীদের সংখ্যা ৪৯ হাজার ৪৩৪ জন।
প্রশাসনে নারীর অবস্থানের বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়েজ আহম্মদ দৈনিক চিত্রকে বলেন, ‘সরকার নারীর ক্ষমতায়ন যাতে নিশ্চিত হয়, কর্মস্থলকে যাতে নারীবান্ধব করা যায়, শিক্ষার ক্ষেত্রে যে সব সুবিধা দিলে নারীরা এগিয়ে আসবে- সবক্ষেত্রেই সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সরকার এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এসডিজির যে গোলগুলো আছে, এরমধ্যে নারীর ক্ষমতায়ন এবং বৈষম্য নিরসনের ক্ষেত্রগুলো নির্ধারণ করাসহ সব বিষয় নিয়ে সরকার কাজ করছে। শুধু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নয়, সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগই তাদের অধিক্ষেত্রের মধ্যে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার আগে দেখেছি একজন নারীকে নামে মাত্র একদিনের জন্য সচিব করা হয়। সেই অবস্থা থেকে তো আমরা অনেক দূর এসেছি। প্রশাসনে প্রতিবছরই নারী কর্মকর্তাদের সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে।’

বলা হচ্ছে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নারীরা সেভাবে উঠে আসছেন না- এ বিষয়ে জনপ্রশাসন সচিব বলেন, ‘শুধু সচিব পদ দিয়ে আপনি নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি বিচার করতে পারবেন না। সচিবের ক্ষেত্রে অনেকগুলো বিষয় দেখা হয়। এটি কেবল ডেন্ডার নয়, এটি কেবল চাকরির লেন্থ নয়। এখানে আমার দক্ষতাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।’

ফয়েজ আহম্মদ বলেন, ‘আমি মনে করি প্রধানমন্ত্রীর যে সব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন ভিশন-২০২১, ২০৪১ ও এসডিজি সবগুলোতেই নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি প্রায়োরিটি দেয়া হয়েছে। আমরা দিন দিনই লক্ষ্য অর্জনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’

বিসিএস উইমেন নেটওয়ার্কের এক তথ্যে দেখা গেছে, নারী বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে ২১ শতাংশ, পুলিশ ক্যাডারে ৯ শতাংশ, পররাষ্ট্র ক্যাডারে ২৫ শতাংশ, স্বাস্থ্য ক্যাডারে ১৭ শতাংশ, শিক্ষা ক্যাডারে ২৭ শতাংশ, পরিবার পরিকল্পনা ক্যাডারে ১৩ শতাংশ, কর ক্যাডারে ১১ দশমিক ২ শতাংশ, অডিট ক্যাডারে ২০ শতাংশ, পরিসংখ্যান ক্যাডারে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ।

নারী সচিব রয়েছেন যারা:

সর্বশেষ বৃহস্পতিবারের তথ্য অনুযায়ী, প্রশাসনে পাঁচজন সিনিয়র সচিব, সচিব বা সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন। এরা হলেন- সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জুয়েনা আজিজ, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য শামীমা নার্গিস, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুন নাহার, বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক অথরিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসনে আরা বেগম, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব রৌনক জাহান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব উম্মুল হাসনা।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.