অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ৩০শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

গানের কবি বব ডিলান

Print

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন প্রখ্যাত মার্কিন সংগীতশিল্পী ও গীতিকার বব ডিলান। সাহিত্যে ১১৩তম নোবেল বিজয়ী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণা করেন রয়‌্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমির স্থায়ী সচিব সারা দানিউস। এবারই প্রথম কোনো গীতিকার এই পুরস্কার জিতলেন। সবশেষ ১৯৯৩ সালে মার্কিন হিসেবে কথাশিল্পী টনি মরিসন নোবেল জেতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন ৭৫ বছর বয়সী এই তারকার বন্দনা। আগামী ১০ ডিসেম্বর বব ডিলানের হাতে নোবেল পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।

নোবেল জয়ী বব ডিলানের বন্দনায় যখন সারা বিশ্ব মেতেছে তখন বাংলাদেশের মানুষরাও আনন্দিত। বব ডিলানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেক আগে থেকেই। তিনি বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবেও পরিচিত। ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ এ গিটার আর হারমোনিকা হাতে সংগীত পরিবেশন করেন বব ডিলান। বিখ্যাত ব্যান্ড বিটলসের সংগীতশিল্পী জর্জ হ্যারিসনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের বন্ধু। ওই কনসার্টে জর্জ হ্যারিসন, রিংগো স্টার, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্যাটারসন, রবিশঙ্করের সঙ্গে ছিলেন ডিলানও। গেয়েছিলেন ‘আ হার্ড রেইনস আ গনা ফল’, ‘ব্লোইং ইন দ্য উইন্ড’, ‘জাস্ট লাইক আ ওমেন’সহ কয়েকটি গান।
ডিলানের প্রথমদিককার গানের কথা ছিল মূলত রাজনীতি, সমাজ, দর্শন ও সাহিত্যিক প্রভাব সম্বলিত। নিজস্ব সঙ্গীত ধারা প্রসারের পাশাপাশি তিনি আমেরিকার বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেছেন। তিনি আমেরিকান লোকগীতি ও কান্ট্রি/ব্লুজ থেকে রক অ্যান্ড রোল, ইংরেজ, স্কটিশ, আইরিশ লোকগীতি, এমনকি জ্যাজ সঙ্গীত, সুইং, ব্রডওয়ে, হার্ডরক এবং গসপেলও গেয়েছেন।

তার ‘দি টাইমস দে আর চেঞ্জিং’ সারা পৃথিবীতে যুদ্ধ-বিরোধীদের এবং নাগরিক অধিকার আন্দোলনকারীদের গণ সঙ্গীতে পরিণত হয়েছিল। তার ‘লাইক এ রোলিং স্টোন’ বিদ্রোহের সঙ্গীত হিসাবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়। তাছাড়া ষাটের দশকে ঝড় তুলেছিল ডিলানের ‘হাউ ম্যানি রোডস মাস্ট আ ম্যান ওয়াক ডাউন, বিফর ইউ কল হিম আ ম্যান’ গানটি।

কবি আর ঔপন্যাসিকদের দখলে ছিল সাহিত্যে নোবেল। তাই কোনো গান রচয়িতাকে এ যাবৎ নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়নি। তাই তো সাহিত্যে ডিলানের নোবেল পুরস্কার পাওয়া নিয়ে লেখকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ নোবেল কমিটির সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। আবার কেউবা করেছেন প্রশংসা। শুধু তাই নয়, সাহিত্যে ডিলানের নোবেল জয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিতর্ক চলছে।

নোবেল কমিটির প্রতি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফরাসি ঔপন্যাসিক পিয়েরে অ্যাসোউলিন। তিনি বলেছেন, ‘নোবেল কমিটির এই সিদ্ধান্ত লেখকদের প্রতি অবমাননাকর। আমি ডিলানকে পছন্দ করি। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকর্ম কোথায়? সুইডিশ একাডেমি নিজেদের হাস্যকর করে তুলছে বলে মনে করি।’

স্কটিশ ঔপন্যাসিক আরভিন ওয়েলসও সমালোচকদের দলে। তিনি তাঁর টুইটারে এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।

ভারতীয় গীতিকার জাভেদ আখতার মনে করেন, ডিলানকে সাহিত্যে নোবেল দেওয়ার মধ্য দিয়ে অবিশ্বাস্য এবং আশ্চর্যজনক সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্টকহোমের সুইডিশ অ্যাকাডেমি। সংগীতও যে সাহিত্যের অংশ এতে তা প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘গানকে সচরাচর সাহিত্য হিসেবে ধরা হয় না। বব ডিলান সে ধারণায় পরিবর্তন আনতে দারুণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি দুর্দান্ত একজন শিল্পী।’

অস্কারজয়ী সুরকার এ আর রহমান ফেসবুকে লিখেছেন, ‘তিন প্রজন্মকে গানে গানে প্রভাবিত করার জন্য বব ডিলানকে ধন্যবাদ জানাই। মানুষকে তাদের ম্যাড়ম্যাড়ে জীবনযাপন থেকে সরিয়ে অন্য এক পৃথিবীতে নিয়ে গেছেন তিনি। সাহিত্যে তাঁর নোবেল জয় আমরা উদযাপন করছি।’

বব ডিলানের পুরো নাম রবার্ট অ্যালেন জিমারম্যান। জন্ম ১৯৪১ সালের ২৪ মে। তিনি একজন সুবিখ্যাত গায়ক, গীতিকার, সুরকার, ডিস্ক জকি এবং একই সঙ্গে একজন কবি, লেখক ও চিত্রকর; যিনি ১৯৬০-এর দশক থেকে পাঁচ দশকেরও অধিক সময় ধরে জনপ্রিয় ধারার মার্কন সঙ্গীতের অন্যতম প্রধান পুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বব ডিলানের সংগীত ক‌্যারিয়ারের সূচনা হয় ১৯৫৯ সালে মিনেসোটার এক কফি হাউজে। ঠিকানা বদলে ১৯৬১ সালে নিউ ইয়র্কে যাওয়ার পরের বছরই তার প্রথম অ‌্যালবাম ‘বব ডিলান’ বাজারে আসে। এই শিল্পী, গীতিকার খ‌্যাতির তুঙ্গে পৌঁছান গত শতকের ষাটের দশকে। হাতে গিটার আর গলায় ঝোলানো হারমোনিকা হয়ে ওঠে তার ট্রেডমার্ক।

বব ডিলানের নোবেল পুরস্কার পাওয়া নিয়ে নানান বিতর্ক থাকলেও শেষ পর্যন্ত গান তো কবিতাই। গানের কথা তো সাহিত্যই। ফলে গানের কবি বব ডিলানের এ সম্মান প্রাপ্তি বাড়িয়ে দিল বিশ্বের গীতিকার আর গায়কদের সম্মানও। অভিনন্দন গানের কবি বব ডিলান।

দৈনিকচিত্র.কম/ এম




মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.