অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ৫ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৮ই জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী

গুলশানের হামলার মাস্টারমাইন্ড তামিম ভারতে?

Print

অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস’র কথিত সমন্বয়ক তামিম আহমেদ চৌধুরীসহ জেএমবি’র কমপক্ষে পাঁচ সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী ভারতে প্রবেশ করে থাকতে পারে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে র‌্যাব’র হস্তান্তরকৃত তালিকায় এদের নাম রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ভারত সফরের একদিন আগে এ নামের তালিকা প্রকাশ পায়। এ বিষয়টিই ছিল বৃহ¯পতিবার ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং-এর সঙ্গে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ খবর দিয়েছে ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া।
এতে বলা হয়, এর ক’দিন আগে র‌্যাব একটি তালিকা প্রকাশ করে। এতে ২০১১ সাল থেকে নিখোঁজ ৬৮ জনের নাম ছিল। এদের মধ্যে কমপক্ষে পাঁচ জন ভারতীয় ভূখÐে প্রবেশ করেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। বাংলাদেশে গুলশান হামলার পর পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয় রাজ্যে সতর্কতা জারি করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এবার অন্তত ৫ জন জেএমবি সদস্যের তালিকা ভারতের হাতে দিয়েছে। দুই মাস আগে, চিরাং জেলায় জেএমবি’র একটি শিবিরে হানা দেয় আসাম পুলিশ। ওই শিবির ব্যবহার করে স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো।
খবরে বলা হয়, তালিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহভাজনদের অন্যতম তামিম আহমেদ চৌধুরীকে গুলশান হামলার নেপথ্য কারিগর বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশী বংশোদ্ভ‚ত কানাডিয়ান এ নাগরিক বাংলাদেশের স্থানীয় সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো ও আইএস’র মধ্যকার সংযোগ বলে ধারণা করে নিরাপত্তা বাহিনীগুলো। আবু ইবরাহিম আল-হানিফ নামেও পরিচিত সে। আইএস’র প্রোপাগান্ডা ম্যাগাজিন দাবিক-এর জুন সংখ্যায় তার একটি সাক্ষাৎকারও ছাপা হয়। সূত্র মোতাবেক, ২০১৩ সালে কানাডা ছাড়ে তামিম। এরপর থেকে তার আর কোন হদিস পাওয়া যায়নি।
আরেক সন্দেহভাজন জুনুন শিকদার। কুমিল্লার বাসিন্দা জুনুনকে ২০০৯ সালে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে পুলিশ আটক করেছিল। ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক¤িপউটার সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল সে। জেএমবি’র জন্য সদস্য সংগ্রহ করছিল সে। ২০১৩ সালে আবারও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সঙ্গে কথিত যোগসূত্র থাকার অভিযোগে তাকে আটক করা হয়। পরে জামিনে মুক্তি পেয়ে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমায় জুনুন।
আরেকজনের নাম নাজিবুল্লাহ আনসারী। চাঁপাই নবাবগঞ্জের বাসিন্দা মেরিন প্রকৌশলে পড়তে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমায়। গত বছর চট্টগ্রাম পুলিশ স্টেশনে নিখোঁজ ডায়েরি দায়ের করা হয়। এরপর আনসারী তার ভাইকে চিঠি লিখে জানায় যে, সে আইএস-এ যোগ দিতে ইরাকে যাচ্ছে।
এটিএম তাজুদ্দিন আরেক সন্দেহভাজন। আমেরিকাভিত্তিক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক¤িপউটার সায়েন্স পড়ছিল তাজুদ্দিন। সেও ২০১৩ সাল থেকে নিখোঁজ। এ মাসের শুরুর দিকে ল²ীপুর সদর পুলিশ স্টেশনে একটি নিখোঁজ ডায়েরি নথিভুক্ত করা হয়েছে।
মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ ওজাকি ওরফে সুজিত দেবনাথ ছিলেন জাপানের এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় প্রশাসনের অধ্যাপক। এক বছর ধরে তিনি নিখোঁজ। তার বাবা জনার্দন দেবনাথ নবীনগরে ডায়েরি করেছেন।
এদিকে ভারতের এই সময় পত্রিকা লিখেছে, ‘গুলশান হামলার মূল চক্রীকে চিহ্নিত করে ফেললো বাংলাদেশ সরকার। কানাডার নাগরিক, জন্মসূত্রে বাংলাদেশি তামিম আহমেদ চৌধুরীকেই ওই নারকীয় হত্যালীলার মূল চক্রী বলে মনে করছে বাংলাদেশ সরকার। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রে খবর, এখনও পর্যন্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা এই আইএস জঙ্গির সন্ধানে ভারত সরকারের সহযোগিতাও চেয়েছে শেখ হাসিনার সরকার।
ঢাকার মিরপুর মডেল থানায় গুলশান হত্যালীলার মূল ষড়যন্ত্রী তামিম ও আরও ৯ জন পলাতক জেএমবি জঙ্গির বিষয়ে একটি মামলাও করেছে বাংলাদেশ সরকার। গুলশানের ঘটনার পর বাংলাদেশ সরকারের তদন্তকারী আধিকারিকরা সৌম্যদর্শন তামিম স¤পর্কে বেশ কিছু তথ্য হাতে পান। জানা যায়, মূলত কানাডার অধিবাসী তামিম মাঝে-মধ্যেই বাংলাদেশে আসত। কানাডায় থাকাকালীন শেখ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ নামে নিজেকে পরিচয় দিত তামিম। ২০১৩ সালে কানাডা থেকে উধাও হওয়ার পর বাংলাদেশ-সহ এশিয়ার কোন কোন দেশে তামিম গেছে, সে বিষয়ে এখনও কোনো তথ্য হাতে পাননি গোয়েন্দারা। কানাডায় থাকাকালীন সেখানকার পুলিশ তাকে বার দু’য়েক জিজ্ঞাসাবাদও করেছিল।
কানাডা থেকে সিরিয়ায় পালিয়ে গিয়ে জঙ্গি সংগঠন আইএস-এ যোগদান করা দুই ব্যক্তির সঙ্গে স¤পর্ক থাকার জেরে টরেন্টো শহরের পুলিশের জেরার মুখে পড়েছিল তামিম। গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে নৃশংস হত্যালীলার পরে হন্যে হয়ে যখন মূল চক্রীর সন্ধানে বাংলাদেশ সরকার হাতড়ে বেড়াচ্ছে, তখনই ইন্টারপোলের সূত্র ধরে তাদের কাছে এই তামিমের সঙ্গে বাংলাদেশের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন-বাংলাদেশ বা জেএমবি’র যোগাযোগের প্রত্যক্ষ প্রমাণের তথ্য আসে। এরই মাঝে, গত মঙ্গলবার ঢাকার কল্যাণপুরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ৯ জন সন্দেহভাজন জঙ্গির মৃত্যুর পরে তামিম আহমেদই যে গুলশানের হামলার মূলচক্রী, সে বিষয়ে আরও বেশ কিছু প্রমাণ হাতে পায় বাংলাদেশ সরকার।
ঘটনাস্থল থেকে গুলিতে আহত হয়ে গ্রেপ্তার জঙ্গি ও জেএমবি’র সক্রিয় সদস্য রাকিবুল হাসান ওরফে রেগানকে জেরা করে পুলিশ জানতে পারে তামিমের ভ‚মিকার কথা। পুলিশ এবং গোয়েন্দাদের জেরায় ধৃত রাকিবুল জানায় কানাডা থেকে নিয়মিত ঢাকায় যাতায়াত করত তামিম। কল্যাণপুরে জঙ্গিদের লুকানো ডেরাতেও প্রায়ই হাজিরা দিত সে। জেএমবিকে সবদিক থেকে আর্থিক সাহায্য করত তামিম, জেরায় জানিয়েছে রাকিবুল। ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন রাকিবুলকে লাগাতার জেরা করে তামিম স¤পর্কে আরও তথ্য হাতে পাওয়া যাবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ পুলিশ। বাংলাদেশের গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, কিছুদিন আগেই জেএমবি দু’-ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। একটি শাখার নেতৃত্বে ছিল জেলে থাকা জঙ্গি ভাবধারার প্রচারক মৌলানা সইদুর রহমান। অপর শাখাটির নেতৃত্বে ছিল তামিম।
এই দ্বিতীয় শাখাটিই গুলশান হামলার সঙ্গে জড়িত, এমন প্রমাণ পেয়েছেন গোয়েন্দারা। কল্যাণপুরে নিহত জঙ্গি সাজাদ রউফ ওরফে অর্ক গুলশানের হামলায় নিহত নিবরাস ইসলামের বন্ধু ছিল বলেও জেনেছেন গোয়েন্দারা। তামিম ঢাকার কল্যাণপুরে জঙ্গিদের লুকানো ডেরায় গিয়ে জেএমবি’র সদস্যদের আইএস’র ভাবধারায় জেহাদে উদ্বুদ্ধ করত বলেও জেরায় বলেছে রাকিবুল। তামিমের নেতৃত্বাধীন জেএমবি’র এই শাখাটির সঙ্গে আইএস’র যোগাযোগের প্রকৃষ্ট প্রমাণ বাংলাদেশ সরকারের হাতে এসেছে। কিন্তু সরকারিভাবে তা এখনও সংবাদমাধ্যমকে জানানো হয়নি। মূলত দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা ভেবে, বাংলাদেশ সরকার আরও নিশ্চিত হয়ে এই বিষয়ে এগোতে চাইছে।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.