অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ৬ই বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৩ই শাবান, ১৪৪০ হিজরী

চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ দেশ

Print

দৈনিক চিত্র প্রতিবেদক:
বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ দেশ। রাজধানীসহ সারাদেশে দুই শতাধিক খাতে দৈনিক প্রায় ৫শ’কোটি টাকার চাঁদাবাজি ঘটছে। এসব চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ৬ শতাধিক সিন্ডিকেটের ১০ হাজার অপরাধী। আর ওই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত আছেন ক্ষমতাসীন দলের এক শ্রেণীর নেতাকর্মী ও আইন-শৃঙ্গলা বাহিনীর সদস্যরা। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রেই চলছে চাঁদাবাজির মহোৎসব। চাঁদার দাবি পূরণ না করলে সীমাহীন হয়রানিতে পড়তে হচ্ছে নিরীহ ও নিরুপায় মানুষকে। নানা সিন্ডিকেটে বিভক্ত চাঁদাবাজরা নিজেদের রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করছে ‘লীগের সাইনবোর্ড’। ফলে স্থানীয় প্রশাসনও তাদের চাঁদাবাজি রোধের ঝক্কি-ঝামেলায় পা বাড়ায় না। অনুসন্ধানে জানা গেছে, জনপ্রতিনিধিদেরও একটা বড় অংশ চাঁদাবাজির মূল গডফাদারের ভূমিকা আছেন। সদ্য অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর থেকেই চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটগুলো আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। মাঠ পর্যায়ে কারও নিয়ন্ত্রণ যেন কেউ মানছে না। যে যেভাবে পারছে চাঁদাবাজির নিত্যনতুন খাত আবিষ্কার করে ঝাঁপিয়ে পড়ছে চাঁদাবাজির অপকর্মে।
চাঁদাবাজির বড় সেক্টর হলো পরিবহন খাত। একজন পরিবহন মালিক দৈনিক চিত্রকে বলেন, মাসে তার ৬ লাখ টাকার চাঁদা দিতে হয়। অথচ সব খরচ বাদ দিয়ে তার লাভ লাখ টাকা তুলতেই হিমশিম খেতে হয়। এ খাতের চাঁদাবাজি অনেকটা ওপেন সিক্রেট। অপরদিকে ফুটপাত ঘিরে আছে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট। জানা গেছে, রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন রুটের প্রায় ১৫ হাজার বাস থেকে ১৯টি খাতে প্রতিদিন ৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজির গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ হিসাবে প্রতি মাসে ২৭০ কোটি এবং বছরে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে সংঘবদ্ধ চক্র। ট্রাকচালকরা জানান, আগে সাধারণত ঢাকার একজন সার্জেন্টকে ১০০ টাকা দিয়ে স্লিপ সংগ্রহ করলে সিটির মধ্যে আর কোথাও পুলিশকে চাঁদা দিতে হতো না। কিন্তু বর্তমানে এক সার্জেন্ট অন্য সার্জেন্টের স্লিপকে পাত্তা দেন না, আলাদাভাবেই টাকা দিতে হয়। এর প্রতিবাদ করলে হয়রানি আরও বেড়ে যায়। সড়ক-মহাসড়কে ট্রাক চলাচল করতে গিয়ে একেকটি স্পটে ৫০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কয়েক হাজার টেম্পো ও হিউম্যান হলার চলাচল করে। স্থানভেদে যাত্রী পরিবহনে নিয়োজিত এসব যানের প্রতিটি থেকে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৪০০ টাকা করে চাঁদা তোলা হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি অফিসগুলো এখন সিবিএ নেতাদের চাঁদাবাজির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। প্রকাশ্যে তারা চাঁদা তুলছে। এক সরকারি অফিসে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী একটি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। ওই প্রতিষ্ঠানে সিবিএ নেতা মন্ত্রীকে ভাই বলে সম্বোধন করেন। অথচ ওই প্রতিষ্ঠানের এমডি মন্ত্রীকে স্যার বলে সম্বোধন করছেন। এভাবে সিবিএ নেতাদের দাপট শুরু হয়। পরে ওই প্রতিষ্ঠানে সিবিএ নেতাদের কথা শুনতে অনেকটা বাধ্য হন এমডি। সিবিএ নেতাদের এই বেপরোয়া আচারণের যেন কিছুই করার নেই। যে বাঁধা দিবে সেই বিপদে পড়বে। শত শত কোটি টাকার গ্যাস চুরির তথ্য উঠে এসেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খোদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তা, সিবিএ নেতা এবং শাসক দলের স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিকদের যোগসাজশে বছরের পর বছর ধরে চলছে এই অপকর্ম। কথায় আছে, বিমান (বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস) চালায় নাকি সিবিএ। একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার নয় বিষয়টি। যুগের পর যুগ একই চিত্র। সরকারপক্ষের ‘কার্ড’ দেখিয়ে চলছে এ অনাচার। সরকার বদলে গেলেও দাপট কমে না সিবিএ নামের সিন্ডিকেটটির। নতুন ক্ষমতাসীনদের পক্ষে নাম লিখিয়ে রাতারাতি ভোল পাল্টে ফেলেন নেতারা। তারপর চলে সেই বাধাহীন অপকর্ম। সিবিএ নেতারাই প্রেসক্রিপশন ঠিক করে দেন কিভাবে চলবে বাংলাদেশের পতাকাবাহী সংস্থাটি। বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও চলতে হয় তাঁদের কথামতো। সামান্য স্বার্থহানির ঘটনা ঘটলেই নেতারা বসে যান ধর্মঘটে। বিমানকে লাভজনক করতে সরকার নানা কৌশল হাতে নিলেও দুর্নীতিবাজ সিবিএ নেতাদের কারণে কোনো উদ্যোগই কাজে আসছে না।
এছাড়া থানার চাঁদা, ফাঁড়ির চাঁদা, ঘাট চাঁদা, স্পট চাঁদা, বোবা চাঁদা, বেকার ভাতা, ক্লাব খরচা, নিরাপত্তা ফি, শ্রমিক কল্যাণ ফান্ড, মাস্তান ভাতা, নেতার সম্মানী, মহল্লা চাঁদা, অফিস সালামি ইত্যাদি নানা নামে নানা নামে বছরজুড়েই চলে চাঁদার উৎসব। মূলত চাঁদা ধান্দার কাছেই জীবনযাত্রা বাঁধা পড়ে আছে। ব্যবসা-বাণিজ্য নিশ্চিত রাখতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান টেকাতে, সর্বোপরি প্রাণ বাঁচাতেও কাউকে না কাউকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। মাস্তান-সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজদের রক্ষা পেতে চাঁদা দিতে হয় আইন-শৃক্সখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। রাজধানীর বাসাবাড়িতে নবজাতক জন্মালেও চাঁদার হাত বাড়ায় ভয়ঙ্কর হিজড়া বাহিনী। তারা নবজাতককে ঘিরে হৈচৈ, নাচ-গানের বিপরীতে কেবলই চাঁদা খোঁজে। মৃত্যুর পরও চাঁদার ধকল থেকে নিস্তার নেই। মসজিদের আঙিনায় জানাজা দেওয়াসহ কবরস্থানে দাফন করা পর্যন্ত সব ধাপেই সংশ্লিষ্টদের চাহিদা পূরণ করতে হয় স্বজনদের। এমনকি কবরস্থান থেকে লাশ চুরি ঠেকাতেও মাসোহারা দেওয়াটা এখন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানীর ফুটপাথ থেকে শুরু করে বহুতল ভবন পর্যন্ত সর্বত্রই চলে অভিন্ন চাঁদাবাজি। পরিবহন, ডিশ, ইন্টারনেট প্রোভাইডার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, কোচিং বাণিজ্যসহ অনিয়ম-দুর্নীতি টিকিয়ে রাখার কর্মকান্ডেও নিয়মিত চাঁদা দিতে হয়। নতুন বসতি গড়তে, বাড়ি নির্মাণে, দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালু করতে, এমনকি অনেক এলাকায় বিয়েশাদি, সুন্নতে খতনা অনুষ্ঠান করতে হলেও আশপাশের চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের হাতে চাহিদামাফিক টাকা-পয়সা তুলে দেওয়াটা অনেকটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। মিথ্যা-হয়রানিমূলক কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় ডজন ডজন মামলা-ওয়ারেন্ট মাথায় নিয়ে পালিয়ে থাকারও উপায় নেই। ফেরারি আসামিকেও পরিশোধ করতে হয় মাসোহারার চাঁদা। অন্যথায় ওয়ারেন্ট তামিলকারী পুলিশ টিমের সঙ্গে সোর্স নামের চাঁদাবাজরা আসামির খোঁজে ঘন ঘন অভিযান চালায়। ভাঙচুর ও তছনছ করে বাড়িঘর। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে, গালাগাল দেয়। এসব নিপীড়ন থেকে রেহাই পেতে চাহিদামাফিক মাসোহারা প্রদানে বাধ্য হন ফেরারি আসামিরা।
জানা গেছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির আড়াই শতাধিক পয়েন্টে ফুটপাথ এবং ২৩টি স্থানে অবৈধ হাটবাজার বসিয়ে চাঁদাবাজরা কোটি কোটি টাকা চাঁদা তুলছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী, পুলিশ আর চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট এসব টাকা ভাগাভাগি করে নেয়। রাজধানীর ব্যস্ততম ফুটপাথ-রাস্তায় বসে মাছ, মাংস ও মসলার ব্যবসায়ীরা জনপ্রতি দৈনিক ৭০০ টাকা করে চাঁদা দিচ্ছেন। শার্ট-প্যান্ট, গেঞ্জি বিক্রেতারা চাঁদা দিচ্ছেন ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা করে। ভ্যানে করে যারা ফল বিক্রি করেন তারা দিচ্ছেন ২৫০ টাকা। সবজি বিক্রেতারা দিচ্ছেন ৬০-৮০ টাকা। চা-সিগারেট বিক্রেতারা ৮০ টাকা করে দিচ্ছেন বলে জানান সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। প্রায় একই অবস্থা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, খুলনা সিটি করপোরেশন, সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায়। ওই সময় নগরীতে পেশাদার, অপেশাদার মিলিয়ে ৫ হকার ও ভাসমান দোকানি রয়েছেন। একেকজনের কাছ থেকে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।
পার্বত্য জেলাগুলোয় পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজির মহোৎসব চলছে। দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায় ছোট্ট খুপরিঘর কিংবা একটু ভালো মানের বাড়ি সে যেমনই হোক, সেখানে বাঙালিরা বসবাস করতে গেলে ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হচ্ছে উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনের ক্যাডারদের। পার্বত্য অঞ্চলে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট একাধিক সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি বছর সেখানে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে চাঁদাবাজি হচ্ছে খাগড়াছড়িতে।

দৈনিক চিত্র/এমএইচ




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.