অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ১২ই বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৯শে শাবান, ১৪৪০ হিজরী

তৃণমূল ক্ষুব্ধ, বেকায়দায় বিএনপি

Print

দৈনিক চিত্র প্রতিবেদক:
বারবার ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় বিএনপির তৃণমূল ক্ষুদ্ধ। দৈনিক চিত্রের সঙ্গে আলাপকালে বিএনপির তৃণমূলের নেতারা বলেন, কেন্দ্রের ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত তৃণমূলের ত্যাগী নেতাদের দিতে হচ্ছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না। আস্তে আস্তে কেন্দ্রের ওপর আস্থা হারাচ্ছে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
সর্বশেষ আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ায় বিএনপির হাইকমান্ডের প্রতি দলের তৃণমূল নেতারা ক্ষুব্ধ। তবে এলাকায় অবস্থান ধরে রাখতে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে কেউ কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নিজ নিজ উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। সে ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে কেন্দ্র থেকে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে কি না সে ব্যাপারে এখনও কিছু বলা হচ্ছে না।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ, হিসেবে বলা হয় বর্তমান নির্বাচন কমিশন ও সরকার সুষ্ঠু নির্বাচন হতে দেবে না। তাই নির্বাচনে অংশ নিলেও বিএনপির প্রার্থীরা বিজয়ী হতে পারবে না। অপরদিকে বিএনপির তৃণমূল নেতাদের মধ্যে যারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে তাদের যুক্তি হচ্ছে স্থানীয় সরকারের এ গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে অংশ না নিলে এলাকায় দলের অবস্থান থাকবে না। এ নির্বাচনে বিজয়ের ব্যাপারে অনেক ফ্যাক্টর কাজ করে। তাই নির্বাচনে অংশ নিয়ে ভালভাবে প্রচার চালাতে পারলে অনেকেরই বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর বিজয়ী হতে না পারলেও স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় রাখা সম্ভব হয়। আর এসব কিছু বিবেচনায় নিয়েই কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে কেউ কেউ উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। ২০ দলীয় জোটে বিএনপির শরিক দল জামায়াতসহ আরও ক’টি দলের তৃণমূল নেতারাও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর উপজেলা নির্বাচনের বিষয়ে বিএনপির কয়েকটি বৈঠক হয়। বৈঠককালে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে একটি অংশ চেয়েছিল উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখতে। আর অপর অংশটি নির্বাচনে গিয়ে শোচনীয় পরাজয় বরণ না করে এতে অংশ না নিয়ে সরকারকে চাপে ফেলার পক্ষে অবস্থান নেয়। অবশ্য লন্ডন প্রবাসী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান উপজেলা নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত দিলে সিনিয়র নেতাদের সবাই সে সিদ্ধান্ত মেনে নেয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুমিল্লার একটি উপজেলা চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট উপজেলা বিএনপির সভাপতি দৈনিক চিত্রকে বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন আর উপজেলা পরিষদ নির্বাচন এক নয়। উপজেলা নির্বাচনে এলাকায় প্রার্থীর পারিবারিক প্রভাব, সামাজিক অবস্থান ও কোন দলের প্রার্থী কারা এসব কিছু বিবেচনায় নিয়ে ভোটাররা ভোট দিয়ে থাকে। এসব কারণে, সরকারী দল প্রভাব বিস্তার করতে চাইলেও সবসময় পেরে ওঠে না। বিগত উপজেলা নির্বাচনে বিএনপির অনেক প্রার্থী বিজয়ী হয়েছে। এবারও দলগত সিদ্ধান্ত থাকলে অনেকেই নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হতে পারত। দলের কেন্দ্রীয় নেতারা এসব কিছু চিন্তা না করে নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে কেউ নির্বাচন করলে কেন্দ্র থেকে বাধা দেবে এমন নির্দেশনা দেয়নি। তাই এবারও কোন কোন তৃণমূল বিএনপি নেতা নির্বাচনে অংশ নেবে। আমি নিজেও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে আমার উপজেলার নির্বাচনের তফসিল এখনও ঘোষণা করা হয়নি। যেসব উপজেলার নির্বাচনের তফসিল দেয়া হয়েছে সেসব উপজেলায়ও কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বলে শুনেছি।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করতে ব্যর্থ হয়েছে বর্তমান নির্বাচন কমিশন। এ ছাড়া প্রশাসনের লোকেরাও নির্বাচনে অনিয়মে সহায়তা করেছে। এ কারণে বিএনপি আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ায় কেউ কেউ এলাকায় নিজের অবস্থান ধরে রাখতে নির্বাচন করলে তাদের বিষয়ে কি হবে এমন সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। পরিস্থিতি সাপেক্ষে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে দলীয় প্রতীক ধানের শীষ ব্যবহার করে কেউ নির্বাচন করতে পারবে না।

এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট কারচুপি করে বিএনপির বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। তাই উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও ভোট কারচুপি হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় বিএনপি এ নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে ৪৯২টি উপজেলার মধ্যে ২১৫টি উপজেলায় নির্বাচন করার জন্য তফসিল ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ১০ মার্চ ৮৬টি এবং দ্বিতীয় ধাপে ১২৯টি উপজেলা নির্বাচন হবে ১৮ মার্চ। বাকি উপজেলাগুলোর নির্বাচন পরবর্তী ৩ ধাপে অনুষ্ঠিত হবে। এ বছর জুনের আগেই সকল উপজেলায় নির্বাচন শেষ করতে চায় নির্বাচন কমিশন।

ইতোমধ্যেই আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রথম ২ ধাপের উপজেলা নির্বাচন নিয়ে মাঠে সক্রিয় হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হয় বিধায় এ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়টি অধিক গুরুত্ব পায়। আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীরা নৌকা ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য প্রস্তুত। তবে বিএনপির কোন কোন স্থানীয় নেতা নিজ সিদ্ধান্তে নির্বাচন করলেও দলীয় প্রতীক ধানের শীষ ব্যবহার করতে পারবেন না।

এদিকে বিভিন্ন মহল থেকে বিএনপিকে উপজেলা নির্বাচনে অংশ না নেয়ার পক্ষে মত দেয়া হলেও বিএনপি নেতাদের যুক্তি দেখাচ্ছেন আওয়ামী লীগ এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। এ ছাড়া মাত্র ৮টি ছাড়া সকল সংসদীয় এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাই আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে সরকার ও স্থানীয় সংসদ সদস্যরা এ নির্বাচনে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করবে। আর পুলিশসহ প্রশাসনের লোকজনও সরকারী দলের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন। তাই এ অবস্থায় নির্বাচন করে শোচনীয় পরাজয় বরণের চেয়ে নির্বাচনে অংশ না নিয়ে দেশ-বিদেশে সরকারকে চাপের মুখে ফেলতে পারলে ভবিষ্যতে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবে। তবে বিএনপির এ কৌশল কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে খোদ বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যেও নানান মত রয়েছে।

দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়া তৃণমূল নেতাদের যুক্তি হচ্ছে ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময়ও আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। তখনও প্রশাসন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরকারী দলের পক্ষে কাজ করেছে। তারপরও বিএনপি ৪৯২টি উপজেলার মধ্যে ১৭৬টি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছে। আর ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছে প্রায় ৩০০ জন। এবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে যদি আরও কম উপজেলায়ও বিজয়ী হওয়া যেত তারপরও দলীয়ভাবে নির্বাচনে যাওয়া উচিত ছিল। কারণ, উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিলে সারাদেশের প্রতিটি গ্রাম পর্যায়ে দলের নেতাকর্মীরা নতুন উদ্যমে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়। আর তা না হলে তারা আরও বেশি হতাশ হয়ে এক সময় নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। কেউ কেউ দলও পরিবর্তন করবে। তাতে করে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

সূত্র জানায়, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের কিছু সিনিয়র নেতা চেষ্টা করেছিলেন দলীয়ভাবে উপজেলা নির্বাচন করতে। বিএনপি পন্থী বুদ্ধিজীবীরাও স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ায় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপি হাইকমান্ডের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু সিনিয়র নেতাদের অপর অংশ বিশেষ করে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান না চাওয়ায় দলগতভাবে বিএনপি এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। তবে বিচ্ছিন্নভাবে দলের কোন স্থানীয় পর্যায়ের নেতা উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিলে তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত কি হবে তা এখনও ঠিক করেনি বিএনপি হাইকমান্ড।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.