ব্রেকিং নিউজ
Tuesday ২৬ March ২০১৯
  • :
  • :
অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ১২ই চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৭ই রজব, ১৪৪০ হিজরী

দাবায়া রাখতে পারবা না

Print

দৈনিক চিত্র প্রতিবেদক:
‘একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য কি দারুণ অপেক্ষা আর উত্তেজনা নিয়ে/ লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে/ ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে/ ‘কখন আসবে কবি’?/ …শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে/ রবীন্দ্রনাথের মত দৃপ্ত পায়ে হেঁটে/ অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন/…. কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?/ গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি/ এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।/ সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।’

দেশের স্বনামধন্য কবি নির্মলেন্দু গুণ রক্তক্ষরা একাত্তরের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বহুলপ্রতীক্ষিত শিহরণ-জাগানো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ডাক সংবলিত ঐতিহাসিক বজ্রকঠিন ভাষণের মুহূর্তটি এভাবেই তাঁর কবিতায় তুলে ধরেছিলেন।

বৃহস্পতিবার সেই ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। বাঙালী জাতির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের অবিস্মরণীয় একটি দিন। ’৭৫ পরবর্তী দীর্ঘ একুশ বছর বঙ্গবন্ধুর যে ঐতিহাসিক ভাষণটি বাজানোর ওপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা ছিল, সময়ের ব্যবধানে স্বাধীনতার ডাক সংবলিত বজ্রকঠিন বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণটিই আজ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণের স্বীকৃতি পেয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় জাতিসংঘের শিক্ষা বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো। ইউনেস্কোর স্বীকৃতির পর বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অমূল্য দলিল। তাই বাঙালী জাতি আজ কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করবে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। সারাদেশেই এক আনন্দ-উৎসবের মাধ্যমে দিনটি উদযাপন করবে কৃতজ্ঞ বাঙালী জাতি।

আজ থেকে ৪৯ বছর আগের কথা। পরাধীনতার দীর্ঘ প্রহর শেষে পুরো জাতি তখন স্বাধীনতার জন্য অধীর অপেক্ষায়। শুধু প্রয়োজন একটি ঘোষণার, একটি আহ্বানের। অবশেষে ৭ মার্চ এলো সেই ঘোষণা। অগ্নিঝরা একাত্তরের এইদিনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা নামক মহতী কাব্যের স্রষ্টা কবি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রগম্ভীর কণ্ঠ থেকে ধ্বনিত হয়েছিল স্বাধীনতার ঘোষণা। বঙ্গবন্ধু শুধু স্বাধীনতার চূড়ান্ত আহ্বানটি দিয়েই ক্ষান্ত হননি, স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের রূপরেখাও দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষণা মুক্তিকামী মানুষের কাছে লাল-সবুজ পতাকাকে মূর্তিমান করে তোলে। আর এই মাধ্যমে বাঙালীর ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা হয়। শুধু স্বাধীনতা যুদ্ধে নয়, বঙ্গবন্ধুর সেই বজ্রনির্ঘোষ ভাষণ আজও বাঙালী জাতিকে উদ্দীপ্ত করে, অনুপ্রাণিত করে। মূলত রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণই ছিল ৯ মাসব্যাপী বাংলার মুক্তি সংগ্রামের মূল ভিত্তি।

ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) মুক্তিপাগল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে দেয়া বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক এই ভাষণ থেকেই মূলত স্বাধীনতার অঙ্কুরোদগম ঘটতে থাকে এ বাংলায়। বাঙালীর নিজের দেশের হাজার বছরের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়ার অবশ্যম্ভাবী পরিণতির দিকে এগুতে থাকে। আজ সেই ঐতিহাসিক দিন, ৭ মার্চ। বাঙালী জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা একটি অনন্য সাধারণ দিন।

দেখতে দেখতে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের বয়স ৪৯-এ ঠেকেছে। সময়ের বিবর্তনে অনেক কিছুই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। বিকৃতির নিকৃষ্ট ষড়যন্ত্রের আবহে বদলে ফেলার চেষ্টা হয়েছে স্বাধীনতার অনেক ইতিহাস। কিন্তু এই ৪৯ বছরে অনেক কিছুই বদলে গেলেও বদলানো যায়নি শুধুমাত্র ১৯ মিনিটের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সেই ভাষণটি। বিশ্বের অনেক মনীষী বা নেতার অমর কিছু ভাষণ আছে। বিশ্বের মধ্যে এই একটি মাত্র ভাষণ যা যুগের পর যুগ, বছরের পর বছর, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বেজে চলেছে- কিন্তু ভাষণটির আবেদন আজও এতটুকু কমেনি।

বরং যখনই প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ঐতিহাসিক ভাষণটি শ্রবণ করেন, তখনই তাঁদের মানসপটে ভেসে ওঠে স্বাধীনতার গৌরবগাঁথা আন্দোলন-সংগ্রামের মুহূর্তগুলো, আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠে দেশপ্রেমের আদর্শে। ৪৯ বছর ধরে একই আবেদন নিয়ে একটানা কোন ভাষণ এভাবে শোনার নজির বিশ্বের ইতিহাসে নেই। নানা গবেষণার পর মাত্র ১৯ মিনিটের বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক ভাষণটি আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণের অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

কী হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক দিনে ॥ স্বাধীনতার জন্য সারাদেশ থেকে ছুটে আসা পিপাসার্ত মানুষের ঢলে একাত্তরের এদিন রেসকোর্স ময়দানের চতুর্দিকে রীতিমতো জনবিস্ফোরণ ঘটে। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে নারী পুরুষের স্রোতে সয়লাব হয়ে যায় তখনকার ঘোড়দৌড়ের এই বিশাল ময়দান। বিকেল ৩টায় সমাবেশ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সকাল থেকেই মানুষের ভিড়ে তিল ধারণের ক্ষমতা হারায় সেদিনের রেসকোর্স। রাজধানী ঢাকার চতুর্দিকে ভারি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানী সামরিক জান্তারা রক্তচক্ষু নিয়ে প্রহরায়। আকাশে উড়ছে হানাদারদের যুদ্ধ জঙ্গী বিমান। মুক্তিপাগল বাঙালীর সেদিকে ন্যূনতম ভ্রুক্ষেপ নেই। সবার শুধু অপেক্ষা তাঁদের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু কখন আসবেন।

গণমানুষের স্লোগানের মধ্য দিয়ে বিকেল তিনটা ২০ মিনিটে জনসমুদ্রের মঞ্চে আসেন স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু। আকাশ কাঁপিয়ে স্লোগান উঠে- ‘বীর বাঙালী অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’, ‘তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ’। মঞ্চে দাঁড়িয়েই বিশাল জনসমুদ্রে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে বাঙালী জাতিকে মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার উদাত্ত আহ্বান জানান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। পাকিস্তানী সামরিক জান্তাদের বঙ্গবন্ধু সাফ জানিয়ে দেন, স্বাধীনতাকামী জনতাকে আর বুলেট-বেয়নেটে দাবিয়ে রাখা যাবে না। তাই বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠে রেসকোর্সের মাঠে তিনি আবৃত্তি করেন বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ কবিতা, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

মুজিবের স্বাধীনতার ডাকে রক্ত টগবগিয়ে ওঠে মুক্তিপাগল বাঙালীর। মুহূর্তেই উদ্বেল হয়ে ওঠে জনতার সমুদ্র। মুহুর্মুহু স্লোগানে কেঁপে ওঠে বাংলার আকাশ। নড়ে ওঠে হাতের গর্বিত লাল-সবুজ পতাকা, পতাকার ভেতরে সোনালি রঙে আঁকা বাংলাদেশের মানচিত্র। সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু উদাত্ত কণ্ঠে বলেছিলেন- ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমাদের কাছে অনুরোধ রইল ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে, তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো…’।

সেদিন বেতারে সরাসরি বঙ্গবন্ধু মুজিবের ঐতিহাসিক এই ভাষণটি প্রচারের কথা থাকলেও তা করতে দেননি পাকিস্তানী সামরিক জান্তারা। কিন্তু মুখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ে শেখ মুজিবের নির্দেশ, ‘আজ থেকে কোর্ট-কাচারি, আদালত, ফৌজদারি আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরিবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষের কষ্ট না করে, সেজন্য যেসব অন্যান্য জিনিস আছে, সেগুলোর হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিক্সা, গরুর গাড়ি, রেল চলবে। ….সেক্রেটারিয়েট ও সুপ্রীমকোর্ট হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমি-গবর্নমেন্ট দফতর, ওয়াপদা- কোন কিছুই চলবে না। …আমরা ভাতে মারব, আমরা পানিতে মারব…আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না।’

বেতারে বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক ভাষণ সম্প্রচার না করার প্রতিবাদে বেতারের বাঙালী কর্মচারী তাৎক্ষণিক ধর্মঘট শুরু করে। ফলে বিকেল থেকে ঢাকা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। তবে গভীর রাতে তৎকালীন সামরিক কর্তৃপক্ষ ঢাকা বেতারে বঙ্গবন্ধুর রেসকোর্সের ভাষণের পূর্ণ বিবরণ প্রচারের অনুমতি দেয়। পরদিন সকালে বঙ্গবন্ধুর সেই কালজয়ী ভাষণ দিয়েই ঢাকা বেতার কেন্দ্র পুনরায় চালু হয়।

স্বাধীনতার জন্য সারাদেশ থেকে ছুটে আসা পিপাসার্ত মানুষের তৃষ্ণা মিটল বঙ্গবন্ধুর মাত্র ১৯ মিনিটের অমর কবিতায়, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণে। এই একটি ভাষণেই নিরস্ত্র বাঙালীকে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করেন বঙ্গবন্ধু। বিশ্বের ইতিহাসে কোন রাষ্ট্রনায়ক বা নেতা স্বাধীনতার ঘোষণা পূর্ব এ ধরনের ভাষণ দেয়ার নজির নেই। বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষণার দিন থেকেই মূলত সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার অঙ্কুরোদগম ঘটতে থাকে এ বাংলায়। বাঙালীর নিজের দেশের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেয়ার অবশ্যম্ভাবী পরিণতির দিকে এগুতে থাকে। কেননা একাত্তরের ৭ মার্চ জাতির জনকের কণ্ঠে ঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণা শোষিত-নির্যাতিত বাঙালী জাতিকে মুক্তির জন্য অস্থির-পাগল করে তুলেছিল। পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসনের নিগড় থেকে মুক্তির তীব্র আকাক্সক্ষার উন্মাতাল সেই তরঙ্গ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে শ্যামল বাংলার আনাচে কানাচে।

বঙ্গবন্ধুর অমোঘ মন্ত্রে দীক্ষিত-প্রাণিত হয়ে কঠিন সংগ্রামে জীবন বাজি রেখে দেশ থেকে হানাদারমুক্ত করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল গোটা জাতি। শুধু অদম্য মনোবলকে সম্বল করে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে নিরস্ত্র বাঙালী মুখোমুখি হয়েছিল পাকিস্তানের আধুনিক সমরসজ্জিত, প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। মৃত্যুপণ লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে দুঃসাহসে দীপ্ত মুক্তিকামী বাঙালী একাত্তরের মাত্র ন’ মাসে প্রবল পরাক্রমশালী পাক হানাদারদের পরাস্ত-পর্যুদস্ত করে ছিনিয়ে এনেছিল মহামূল্যবান স্বাধীনতা। ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মদান, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ, দুঃসাহসিকতা আর আড়াই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বাঙালী অর্জন করল নিজস্ব মানচিত্র, লাল-সবুজের পতাকা।

এ কারণেই ৭ মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় গৌরবের দিন। আজ গৌরবোদ্দীপ্ত হয়ে দিনটিকে বাঙালী জাতি গভীর আবেগ, ভালবাসা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। কৃতজ্ঞ বাঙালী স্মরণ করে স্বাধীনতার মহানায়ক, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

কর্মসূচী ॥ ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ বৃহস্পতিবার দেশব্যাপী ঐতিহাসিক ৭ মার্চ পালন করবে। দলটির আওয়ামী লীগের কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে- আজ ভোর সাড়ে ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবন ও দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল ৭টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ এবং বিকেল ৩টায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আলোচনা সভা। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় জাতীয় নেতারা ও বরেণ্য বুদ্ধিজীবীরা বক্তব্য রাখবেন।

এছাড়া ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, যুব মহিলা লীগ, ছাত্রলীগ, তাঁতী লীগ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, জয়বাংলা সাংস্কৃতিক ঐক্যজোটসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান দিবসটি উপলক্ষে পতাকা উত্তোলন, জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল, আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে।

যে ভাষণে বাঙালী নিজেকে আবিষ্কার করে বারবার:

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, বলার অপেক্ষা রাখে না, বারবার শোনা। টেলিভিশন খুললেই দেখা যায়। এর পরও পুরনো হয় না। বরং চির নতুনের বেশে সামনে আসেন ‘তোমার নেতা আমার নেতা/শেখ মুজিব শেখ মুজিব।’ অবিসংবাদিত নেতার বজ্রকণ্ঠ সেই যে কাঁপিয়ে দিয়েছিল রেসকোর্স, এখনও তা-ই। রেকর্ড বেজে উঠতেই লোম, কেন যেন, কীভাবে যেন দাঁড়িয়ে যায়। একটা তরঙ্গ হয় শরীরে। মন সাহসী হয়ে ওঠে।

সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন- কী আছে এই ভাষণে? গবেষকরা নানা দৃষ্টিকোণ থেকে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্লেষণ করেছেন। বিশ্লেষণ করে চলেছেন। মাত্র ১৭ মিনিটের ভাষণের বিপরীতে অযুত লেখালেখি। তবুও শেষ হয় না। নতুন নতুন অর্থ নিয়ে সামনে আসছে ৭ মার্চের ভাষণ। বাঙালীর স্বাধীনতা লাভের আকাক্সক্ষা যখন চরম পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, ঠিক তখন ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্সের জনসমুদ্রে ভাষণ দেন শেখ মুজিবুর রহমান। গোটা ভাষণটি ছিল অলিখিত। বুকে জমা কথাগুলোই বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু। এ ক্ষেত্রে তাঁকে নিজের ওপর ভরসা রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন প্রিয়তম পত্নী ফজিলাতুন্নেসা মুজিব। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার একটি লেখা থেকে এ সম্পর্কে জানা যায়। অশান্ত মুজিবকে ফজিলাতুন্নেসা বলেছিলেন, ‘তোমার কথার ওপর সামনের অগণিত মানুষের ভাগ্য জড়িত, তাই তুমি নিজে যেভাবে যা বলতে চাও নিজের থেকে বলবে। তুমি যা বলবে সেটাই ঠিক হবে। দেশের মানুষ তোমাকে ভালবাসে, ভরসা করে।’ স্ত্রীর কথা রেখেছিলেন শেখ মুজিব। যেটুকু বলা প্রয়োজন তার বাইরে তিনি যাননি। হয়তো তাই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা রেখেছিল এই ভাষণ। বাংলাদেশ রাষ্ট্র কাঠামোর প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছিল। আর বর্তমানে শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা দুনিয়ায় ভাষণটি ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ হিসেবে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ইউনেস্কো ভাষণটিকে বিশ্বের প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায়ও যথেষ্ট এগিয়ে বাঙালী নেতার ভাষণ।

স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ হলেও, বাঙালী এই ভাষণটিকে যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ করেছিল। কৌশলী শেখ মুজিব এদিন সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। দেননি বটে। বাকিও রাখেননি খুব কিছু। আরও অনেকের মতো জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ৭ মার্চকে স্বাধীনতা ঘোষণার দিন বলেই মানেন। এক বিশ্লেষণে তিনি লিখেছেন, ‘একাত্তরের প্রবাসী সরকার বিভিন্ন বিবেচনায় ২৬ মার্চকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে এতে করে ৭ মার্চের গুরুত্ব হারায়নি। বরং গুরুত্বের ভিত্তি মজবুত হয়েছে।’

নিজ কানে ভাষণ শোনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এক নিবন্ধে দার্শনিক সরদার ফজলুল করিম লিখেছেন, ‘আমার অবয়বকে আমি যথার্থই ছাড়িয়ে যাচ্ছিলাম। দেহ আমার দীর্ঘ হচ্ছিল। শরীরে আমার রোমাঞ্চ জাগছিল। সাহস বৃদ্ধি পাচ্ছিল। আর তাই পাকিস্তানী জঙ্গী বিমানগুলো আমার মাথার ওপর দিয়ে সগর্জনে যখন যাওয়া-আসা করছিল এবং সে বিমান থেকে যে কোন মুহূর্তে যে মৃত্যুর বাণ আমার বুকে এসে বিঁধতে পারে, সে কথা জেনেও আমার পা একটুও কাঁপছিল না।’

৭ মার্চের জনসমুদ্রে মহানায়ক হয়ে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু। গাজী আজিজুর রহমানের বর্ণনায়, ‘সেদিনের ১৯ মিনিটের বিকেলটা ছিল শুধু তাঁর। সেদিন আর কোন দৃশ্য ছিল না তাঁর দৃশ্য ছাড়া। সেদিন আর কোন কণ্ঠস্বর ছিল না তাঁর কণ্ঠস্বর ছাড়া। সেদিন একটিমাত্র নদী কলস্বরিত ছিল বাঙলায়। সেদিন তিনিই ছিলেন বাঙলার দিনমণি-অংশুমালী। সেদিন সবাই দেখল এলবাট্রস পাখিকে, এক প্রমিথিউসকে, এক হারকিউলিসকে দেখল স্পার্টাকা-সরূপী এক অবিসংবাদিত ত্রাতাকে।’ ভাষণটিকে অতি বাস্তব, ইতিহাসনিষ্ঠ, ঐশ্বর্যমন্ডিত বলিষ্ঠ, কবিত্বময়, নাটকীয় এবং একটি নিষ্পেষিত জাতির মুক্তির দলিল হিসেবে বর্ণনা করেছেন তিনি। লিখেছেন, ‘কথোপকথনের ভঙ্গিতে সাবলীল ভাষায় বর্ণিত এর আবেগ, সজীবতা, নাটকীয়তা, দিকনির্দেশনা, প্রমিত আঞ্চলিক বিদেশী ভাষার মিথস্ক্রিয়া, আপনি তুমি সর্বনামের সম্ভ্রমমূলক ব্যবহার, বজ্রকণ্ঠের বাগবৈদগ্ধ, সম্মোহিত করার জাদুকরি আকর্ষণ, মন্ত্রমুগ্ধতা, যুদ্ধ ঘোষণা করেও যুদ্ধে অবতীর্ণ না হওয়ার কৌশল সব মিলে একই অঙ্গে এত রূপের প্রাচুর্যের কারণেই এই ভাষণের শ্রেষ্ঠত্ব।’




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.