অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ১২ই ফাল্গুন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৮ই জমাদিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী

দেশে ফিরেছেন এরশাদ

Print

দৈনিক চিত্র প্রতিবেদক:
জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ দেশে ফিরেছেন। শারীরিক অবস্থার ‘উল্লেখযোগ্য’ উন্নতি হওয়ায় চিকিৎসা শেষে সিঙ্গাপুর থেকে সোমবার রাত ১০টা তিনি দেশে আসেন । তার সঙ্গে ফিরেছেন ছোটভাই হুসেইন মোর্শেদ, তার স্ত্রী রুমানা মোর্শেদ ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মেজর (অব.) খালেদ আখতার।

সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান বেগম রওশন এরশাদ এমপি, কো-চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলীয় উপনেতা জি এম কাদের এমপি, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পুত্র শাদ এরশাদ ও এরিখ এরশাদ। এছাড়া উপস্থিথ ছিলেন পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা এমপি, প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যরিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমপি, এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, মুজিবুল হক চুন্নু এমপি, গোলাম কিবরিয়া টিপু, সুনীল শুভরায়, এস এম ফয়সাল চিশতী, আজম খান, অধ্যাপিকা মাসুদা এম রশিদ, অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম, এ টি ইউ তাজ রহমান, ব্যরিস্টার দিলারা খন্দকার, রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া ও ফখরুজ্জামান জাহাঙ্গীরসহ জাতীয় পার্টি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
গত ২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নিয়মিত মেডিকেল চেক-আপ ও চিকিৎসা শেষে সোমবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ১০টায় সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি বিমান যোগে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর সময়সূচি রয়েছে এরশাদের। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হওয়ায় বর্তমানে সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে হাসপাতালের বাইরে অবস্থান করছেন এরশাদ।

রাজনীতিতে আলোচিত নাম এরশাদ:
দেশের রাজনীতিতে বহুল আলোচিত নাম এইচএম এরশাদ। সেনাপ্রধান থেকে ক্ষমতা দখল। এরই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে নয় বছরের শাসন। অতপর রাজনীতিতে টিকে থাকা। ১৯৮২ সাল থেকে টানা ৩৭ বছরের ইতিহাসে যুক্ত হয়েছে তার ভাল-মন্দের নানা দিক। কোন কোন কাজের তীব্র সমালোচনা। আবার উন্নয়নসহ কিছু কাজ এখনও মনে রেখেছেন দেশের মানুষ। কবি ও প্রেমিক হিসেবে খ্যাত প্রবীণ এই রাজনীতিক নিজ মুখেই বলেছেন, সামরিক শাসক হিসেবে ক্ষমতা নেয়ার পর রাজনীতিতে টিকে থাকার ইতিহাসে বিরল ব্যক্তি তিনি। তবে ক্ষমতাচ্যুতির পর স্বাধীনভাবে খুব একটা রাজনীতি চর্চা হয়নি তার। বড় দু’দলের কাছে কার্যত বন্দী এরশাদ। তার দীর্ঘ পথ চলায় মন্দ কাজের জন্য সমালোচিত বেশি। তবে ভাল কাজও তিনি অনেক করেছেন। শেষ পর্যন্ত বার বার মত পাল্টানো নেতা হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেছেন। সকালে এক বিকেলে অন্য কথা বলে এই খ্যাতি অর্জন করেছেন তিনি। অর্থাৎ রাজনীতির ময়দানে কোন সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারেননি রাজনীতির পড়ন্ত বিকেলেও। তিনি সব সময় বলতেন রাজনীতিতে শেষ কথাা বলে কিছু নেই। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন এরশাদের শারীরিক অবস্থা সুস্থ হওয়ায় আগামীকাল সোমবার তিনি দেশে ফিরছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেতারা বলছেন, ক্ষমতায় থাকতে নিজের কর্মোন্ডের জন্য এরশাদ অনেক বেশি সমালোচিত। অর্থাৎ তার ভাল-মন্দ দুটো দিকই রয়েছে তার মধ্যে। ক্ষমতায় থাকার সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে সারাদেশে কয়েক হাজার নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে এরশাদের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক দলে ভাঙ্গনসহ গোটা রাজনৈতিক অঙ্গন কলুষিত হয়েছিল তার কিছু নেতিবাচক সিদ্ধান্তের কারণে। তবে ইতিবাচক কিছু কর্মকান্ডের কারণে ক্ষমতাচ্যুতির পরও রাজনীতিতে টিকে আছেন তিনি। তাছাড়া তার সময়ে কিছু সিদ্ধান্ত রাজনীতিতে পরবর্তী ২৮ বছরেও দেখা যায়নি।

‘দেশের জন্য যা করেছি এবং আগামীতে যা করতে চাই’ জাতীয় পার্টির প্রচার ও প্রকাশনা সেল থেকে প্রকাশিত গ্রন্থে এরশাদ বলেন, এক বিপর্যস্ত বাংলাদেশের দায়িত্ব আমাকে গ্রহণ করতে হয়েছিল। তারপর অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে নয়টি বছর কেটে গেছে। এই সময়ের মধ্যে আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছি একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার। সেখানে কতটুকু সফল হয়েছি বা বিফল হয়েছি- তার মূল্যায়ন করতে হলে পরবর্তী সময়ের সঙ্গে আমার আমলের যোগবিয়োগ করার প্রয়োজন হবে। আমার মনে হয়, দেশের মানুষ সে অঙ্কটি নির্ভুলভাবে করতে পেরেছে।

এরশাদ বলেন, ‘…আমি যেহেতু একজন সর্বক্ষণিক রাজনীতিবীদ সেহেতু আমার চিন্তা-চেতনা-ভাবনায় রাজনৈতিক প্রসঙ্গ প্রাধান্য পেয়ে থাকে। …আমি ’৯০-এর ডিসেম্বরে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহ এবং একজন প্রধান বিচারপতিকে বিশ্বাস করে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়েছিলাম। তারপর উভয়পক্ষের রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার ফলশ্রুতিতে আমাকে জেলে যেতে হয়েছে। অতপর জনতার আদালতে আমি সুবিচার পেলেও ক্ষমতার আদালত আমাকে মুক্তি দেয়নি। একনাগাড়ে ছয় বছর জেলে দুর্বিসহ দিন কাটিয়ে বাইরে এসে দেখলাম, আমার এই একান্ত প্রচেষ্টায় গড়া এক সমৃদ্ধ নতুন বাংলাদেশ আবার তামাটে হয়ে গেছে। গত দেড় দেশকে ক্রমান্বয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাচ্ছে।

এই বইতে এরশাদ প্রথম ধাপে ২০৭টি উন্নয়ন কর্মকান্ডের চিত্র তুলে ধরেন। আরেকটি ভাগে আরও ১৭৩টি উন্নয়ন কাজের বিবরণ দেয়া হয়। তার বইতে উল্লেখিত উন্নয়ন কর্মকান্ডের মধ্যে রয়েছে -উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তন, জেলা-উপজেলা ভিত্তিক ৩ স্তরবিশিষ্ট বিকেন্দ্রীকরণমূলক প্রশাসন চালু, ৪৬০ থানাকে উপজেলায় উন্নীত করা, শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি ঘোষণা, গ্রাম সরকার পদ্ধতি বিলোপ, হাইকোর্ট বেঞ্চ সম্প্রসারণ, প্রতি জেলায় মুন্সেফ কোর্ট, নারী নির্যাতনের জন্য কঠোর শাস্তি, জাতীয় প্রেস কমিশন গঠন, আর্থিক নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ, রফতানি বাণিজ্য বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফিতি হার হ্রাস, শিল্প-বাণিজ্য, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন, কৃষক ও কৃষি উপকরণ সহজলভ্য করা, শিক্ষা বিষয়ক পদক্ষেপ, অবকাঠামো উন্নয়ন, নৌ যোগাযোগ, বিমান ও টেলিযোগাযোগ, পানি উন্নয়ন, বৈদ্যুতিক ও খনিজ শক্তি, নির্মাণ কাজ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সম্প্রসারণ, সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, জাতীয় ঈদগাহ নির্মাণ, তিন জাতীয় নেতার মাজারের নির্মাণ কাজ, ওয়ারী খাল সম্প্রসারণ, ঢাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও ট্রেনের নামকরণ।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সরকারকে হটিয়ে সেনাবাহিনীর চীফ অব স্টাফ লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন। ওই দিন বেতার ও টেলিভিশনে প্রচারিত ভাষণে তিনি বলেন, জনগণের ডাকে সাড়া দিতে হয়েছে। তাছাড়া জাতির সামনে আর কোন বিকল্প ছিল না। তিনি বাংলাদেশে দ্বিতীয়বারের মতো সামরিক শাসন জারি করে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেন। এ নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়লেও কোন কিছুকে তোয়াক্কা করেননি সাবেক এই সেনাপ্রধান। ক্ষমতার লোভে নিজের মতো করেই সবকিছু করার চেষ্টা করেছেন।

১৯৮৩ সালের ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। কমপক্ষে পাঁচ ছাত্র নিহত ও শতাধিক আহত হন। এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রথম বলি হলেন জয়নাল, কাঞ্চন, মোজাম্মেল, জাফর ও দীপালি সাহা। এরশাদের সেনাশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে সেই প্রথম রক্ত ঝরেছিল ঢাকার রাজপথে। এর পরও অনেক তরুণের রক্ত ঝরেছে। নূর হোসেন আর ডাঃ মিলন তো মুখে মুখে উচ্চারিত নাম।

এরশাদ আনুষ্ঠানিকভাবে মসনদ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০। আর ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো অংশ না নেয়ায় তার পক্ষে ক্ষমতায় টিকে থাকা আর সম্ভব ছিল না। প্রতিবছর ছয় ডিসেম্বর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে স্বৈরাচার পতন দিবস পালন করা হয়। এরশাদ এই দিনটিকে গণতন্ত্র রক্ষা দিবস হিসেবে উদযাপন করেন।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেনের এক লেখায় বলা হয়, এরশাদের পতন গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই হতে হবে এ ধরনের একটা প্রতিজ্ঞা ছিল জাসদ ও সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ৫ দলীয় ঐক্যজোটের। তাই জনগণের ক্ষোভ গণঅভ্যুত্থানের দিকে নিয়ে যাওয়াতেই তাদের সচেতন প্রয়াস ছিল। ১৯৮৩ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারি, ২২-২৩ ডিসেম্বর শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) টানা ৪৮ ঘণ্টা দেশব্যাপী হরতাল, ১০ নবেম্বর ১৯৮৭ থেকে টানা ঢাকা অবরোধ এবং সর্বশেষ ডাঃ মিলন হত্যাকান্ডের পরে সফল গণঅভ্যুত্থান। এ সবই ছিল জাসদ ও সমাজতন্ত্রীদের সচেতন প্রয়াসের ফল। এ প্রসঙ্গে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বলে: আর এই পুঁজিবাদী সমাজে ক্ষমতা দখলের জন্য আন্দোলনের রূপ যেহেতু অভ্যুত্থানধর্মী হতে বাধ্য, সেহেতু সংগঠন ও আন্দোলনকে তার সঙ্গে তাল রেখেই পা ফেলতে হবে।

২৭ নবভম্বর যেদিন এরশাদনামা লিখছি, সেদিন শহীদ মিলন দিবস। ১৯৯০ সালের এই দিনে সাবেক স্বৈরাচারের পেটোয়া বাহিনী ডাঃ শামসুল আলম মিলনকে হত্যা করে। তার আত্মদানের মধ্য দিয়েই নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান চূড়ান্ত রূপ নেয়। এরশাদ সেদিন জরুরী অবস্থা ঘোষণা করলে সাংবাদিকরা অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট করেন। স্বৈরাচারের পতন না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে কোন পত্রিকা প্রকাশিত হয়নি।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা শফী আহমেদ। ছাত্র রাজনীতিতে থাকা অবস্থায় এরশাদের শাসনামলে ভাল-মন্দ সবই দেখেছেন তিনি। এরশাদের উভয়দিক সম্পর্কে জানতে চাইলে বর্তমান আওয়ামী লীগের এই কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, একটি নির্বাচিত সরকারকে উচ্ছেদ করে সংবিধান লঙ্ঘন করে ক্ষমতা দখল করাই ছিল এরশাদের প্রথম অপরাধ। শিক্ষানীতিতে হাত দেয়া ও সকল নেতাকর্মীকে নির্বিচার গ্রেফতার করা মোটেই ইতিবাচক দিক ছিল না। তিনি বলেন, এরশাদের নয় বছরের শাসনে রাজনৈতিক দলগুলো ভাঙনের শিকার হয়। গোটা রাজনীতিকে কলুষিত করে নিজের দল গঠন চূড়ান্ত করেন তিনি। তার ভুল ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ছাত্র সংগঠন থেকে শুরু করে সমাজের সব স্তরের মানুষ রাজপথে সোচ্চার ছিল। এতে অসন্তুষ্ট ছিলেন এরশাদ। নয় বছরে কয়ক হাজার মানুষকে তিনি হত্যা করেছেন।

সাবেক ছাত্রনেতা শফী বলেন, ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় এরশাদের নির্দেশে গুলি চালিয়ে পুলিশ ২৪ জনকে হত্যা করে। এরপর রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করার মধ্য দিয়ে সংবিধানের মূল চেতনায় আঘাত হানেন তিনি। এই সিদ্ধান্তের ফলে অন্য ধর্মের লোকজনকে এরশাদ দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক করে পাশাপাশি রাষ্ট্রকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেন এই শাসক। তার করা চিকিৎসানীতি দেশকে আরও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

তিনি বলেন, এরশাদ নিজে কবি না হয়ে ভাড়াটে কবির মাধ্যমে কবি হিসেবে পরিচিতি নেয়ার চেষ্টা করেন। নারী ঘটিত কেলেঙ্কারির শেষ নেই তার। চোরাকারবারিদের মদদও দিয়েছিলেন সাবেক এই রাষ্ট্রপতি। এরশাদের ভাল কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনে উপজেলা ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলেন তিনি। এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ’৯০ সাল পর্যন্ত নির্বাচিত ছাত্র সংসদের কর্তৃত্ব ছিল। নিয়মিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নেতৃত্ব ঠিক করা হতো। তার পতন শেষে দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সরকারগুলোতেও ছাত্র সংসদ সচল হয়নি। অবহেলিত জনপদ হিসেবে এরশাদের আমলে গোটা উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নের কথা এখনও মনে রেখেছেন সবাই।

তিনি বলেন, তার বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোট্ট পরিসরে হলেও আন্দোলন হতো। পরদিন দেখা যেন আন্দোলনের কারণে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন এরশাদ। তার আমলে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুমতি ছাড়া পুলিশের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। রাজপথ ছিল উন্মুক্ত। যে কেউ কোন অনুমতি ছাড়াই সভা, সমাবেশ, প্রতিবাদ করতে পারত। অর্থাৎ কোন কোন ক্ষেত্রে এরশাদ নমনীয়তার পরিচয় দিয়েছিলেন।

ডাঃ মিলন হত্যার প্রতিবাদে এরশাদের পতন চেয়ে গোটা দেশে যখন গণঅভ্যুত্থান শুরু হয় তখন বিদ্রোহ দমন না করে তিনি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে উপরাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়েছিলেন। মওদুদ বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এরশাদের এই নজির গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় অনেক সময় খেয়াল করা যায় না।

১৯৩০ সালের দুই জানুয়ারি রংপুর জেলার দিনহাটায় জন্ম নেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিয়ে পাকিস্তানে চলে যান। ১৯৭৩ সালে পাকিস্তানে আটকেপড়া বাঙালীদের সঙ্গে তিনি দেশে ফেরেন। তারপর আবারও যোগ দেন সেনাবাহিনীতে। ১৯৮৫ সালে প্রথম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন করেন তিনি। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই দলের মনোনয়ন নিয়ে ৫ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তাকে কারাগারে যেতে হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি জামিনের মধ্য দিয়ে তার কারামুক্তি হয়। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে তিনি কারাগার থেকে নির্বাচন করে পাঁচটি আসনে বিজয়ী হন। ২০০০ সালে তার দল জাতীয় পার্টি ভেঙ্গে তিন টুকরো হয়। ১৯৯০ সালের ২৭ নবেম্বর এরশাদের নির্দেশে ডাঃ শামসুল আলম মিলনকে হত্যা করে পুলিশ। প্রতিবছর যথাযোগ্য মর্যাদায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক, সাংস্কৃতিকসহ পেশাজীবী সংগঠন দিবসটি পালন করে। এই ঘটনার মধ্য দিয়েই এরশাদের পতনের যাত্রা শুরু হয়।

এরশাদের অগণতান্ত্রিক কর্মকান্ডের প্রতিবাদে রাজপথ প্রায় সব সময়ই প্রতিবাদ মুখর থাকত। তার আমলে আলোচিত ঘটনার অন্যতম হলো নূর হোসেন হত্যা। ১৯৮৭ সালের ১০ নবেম্বর তৎকালীন স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’, ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ স্লোগান ধারণ করে মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন নূর হোসেন। মিছিলটি গুলিস্তানের জিরো পয়েন্টে পৌঁছানোর পর এর পুরোভাগে থাকা নূর হোসেন গুলিবিদ্ধ হন। তার তাজা রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ, বেগবান হয় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। প্রতি বছরের ১০ নবেম্বর যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘শহীদ নূর হোসেন দিবস’ পালন করা হয়। নূর হোসেনের আত্মাহুতির স্থানটি এখন ‘শহীদ নূর হোসেন চত্বর’ নামে পরিচিত।

সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী ও এরশাদের সামরিক শাসনকে অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করে হাইকোর্ট। ২০১০ সালের ২৬ আগস্ট বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি শেখ মোঃ জাকির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে এ রায় দেয়। সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ১১ নবেম্বর পর্যন্ত সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলের সব কর্মকা-কে বৈধতা দেয়া হয়েছিল। রায়ে আদালত বলেছিল, সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে এরশাদের সামরিক শাসন জারি, আদেশ, সামরিক ফরমান জারি ও কার্যক্রম অবৈধ ঘোষণা করা হলো। তবে ভবিষ্যতে বিশৃঙ্খলা এড়াতে পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ের আলোকে এরশাদের আমলের কর্মকান্ডকে মার্জনা করা হলো।

এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক রওনক জাহান গণমাধ্যমকে বলেন, জেনারেল এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র ফিরে এলেও প্রধান দুই দলের কাছে ভোটের রাজনীতি প্রাধান্য পায়। সেই সুযোগে জেনারেল এরশাদ এবং তার দল জাতীয় পার্টি রাজনীতিতে বৈধতা পায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ এক সাক্ষাতকারে বলেন, নব্বইয়ের শেষে জেনারেল এরশাদের পতনের সঙ্গে সঙ্গেই ঢাকার রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ নেমে এসেছিল। মানুষের উচ্ছ্বাস-আনন্দে সে সময় নগরীর রাস্তাগুলো ভিন্ন চেহারা নিয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে এখনও অনেকে বিস্মিত হন রাজনীতিতে জেনারেল এরশাদের অবস্থান দেখে।

এরশাদের পতনের পর, বিশেষ করে ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে, জাতীয় পার্টি যত ভোট পেয়েছিল সেটি পরবর্তীতে ক্রমাগত কমেছে। অর্থাৎ দলটির জনপ্রিয়তা দিন দিন তলানীতে নামছে। জাতীয় পার্টির ভোট বৃদ্ধি কিংবা হ্রাসের সাথে বিএনপির ভোট হ্রাস-বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছেবলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ফলে ১৯৯১ সালের পর থেকে বিএনপির যত ভোট বেড়েছে জাতীয় পার্টির সমর্থন তত কমেছে বলে মনে করেন মহিউদ্দিন আহমদ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপির সমর্থক গোষ্ঠীর ভেতর থেকেই জাতীয় পার্টির সমর্থন গড়ে উঠেছিল। যেসব জায়গায় জাতীয় পার্টি শক্ত অবস্থানে ছিল সেসব জায়গা ১৯৯৬ সালের পর থেকে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। দেখা গেছে, ১৯৯১ সালে জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসন পায়। ১৯৯৬ সালে পায় ৩২টি, ২০০১ সালে ১৪টি ও ২০০৮ সালে মহাজোটে নির্বাচন করে জাপা ২৭টি আসন পায়। ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় ৩৪টি আসন পায় জাপা। সংরক্ষিত আরও ছয় আসন মিলিয়ে সংসদে বিরোধী দল গঠন করে জাতীয় পার্টি। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২২টি আসন পায় জাতীয় পার্টি। বিরোধী দলের নেতা হন এরশাদ। বর্তমানে তিনি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায়।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.