অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ৪ঠা আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৪ই শাওয়াল, ১৪৪০ হিজরী

পার্বত্যঞ্চলে এত অস্ত্র আসে কোথায় থেকে? ১৫ মাসে ৬৩ জন নিহত

Print

দৈনিক চিত্র প্রতিবেদক:
এখন সবার মুখে একটাই প্রশ্ন পার্বত্যঞ্চলে এত অস্ত্র আসে কোথায় থেকে? মূলত সীমান্ত পথে আসছে এসব অস্ত্র। অস্ত্রের ঝনঝনানিতে একের পর এক প্রাণ ঝরছে।

সবুজ পাহাড় আজ মৃত্যুপুরী। নির্মল কাপ্তাই হ্রদে বইছে রক্তধারা। মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে ঝরেছে আট তাজা প্রাণ। হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন আরও ২০ জন। হামলাকারীদের কখনও সন্ত্রাসী, কখনও বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে চিহ্নিত করা হলেও, নির্দিষ্ট করে কিছু বলা হচ্ছে না। আসলে তারা কারা? এ প্রসঙ্গে কথা বলতে হলে একটু পেছনে ফিরে যেতে হয়। ২০১৭ সালের ২ ডিসেম্বর, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) চুক্তি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ এনে ‘পাহাড়ে আবার আগুন জ্বলবে’ বলে হুঁশিয়ারি দেন। মূলত ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তিনি এমন ঘোষণা দেন বলে ধারণা করা হয়।

ওই ঘোষণার মাত্র দুদিন পর ৫ ডিসেম্বর থেকে পাহাড়ে শুরু হয় রক্তের হলিখেলা। ৫ ডিসেম্বর পাহাড়ে এক ইউপি সদস্যসহ নিহত হন দুজন। পরের দুদিনে তাদের হামলায় গুরুতর আহত হন আওয়ামী লীগের এক নারী নেত্রীসহ আরও দুই আওয়ামী লীগকর্মী।

সর্বশেষ মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুরেশ কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাকে গুলি করে হত্যা করে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীরা। রাঙ্গামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজি মুছা মাতব্বর ওই হামলার জন্য সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে (জেএসএস) দায়ী করেছেন।

এর আগের দিন সোমবার (১৯ মার্চ) সন্ধ্যায় নির্বাচনী দায়িত্ব পালন শেষে ফেরার পথে রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার নয়মাইল এলাকায় সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে প্রিসাইডিং অফিসার ও আনসার সদস্যসহ সাতজন নিহত হন। আহত হন অন্তত ২০ জন। আহতরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে গুরুতর সাতজনকে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়েছে।

ওই ঘটনার পরপরই পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) প্রার্থী ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমা অভিযোগ করেন, জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউপিডিএফ এ হামলা চালায়। তবে পাহাড়ি ওই দুই গ্রুপ এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

সুদর্শন চাকমা গণমাধ্যমকে বলেন, সন্তু লারমার জেএসএসের বড়ঋষি চাকমা নিশ্চিত পরাজয় জেনে সকালে নির্বাচন বর্জনের নাটক করেন। সন্ধ্যায় সরকারি কাজে নিয়োজিতদের ওপর নৃশংস হামলা চালান। স্থানীয় সূত্র জানায়, গতকাল উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে রাঙ্গামাটির ১০ উপজেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু দুপুরে রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি, নানিয়ারচর ও কাউখালী উপজেলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি (জেএসএস) সমর্থিত স্বতন্ত্র তিন চেয়ারম্যানপ্রার্থীসহ অন্য আট ভাইস-চেয়ারম্যানপ্রার্থী ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।

অভিযোগ আছে, ভোট বর্জন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) দেয়া বিবৃতিতে স্পষ্টতই হুমকি ছিল। সেখানে তারা লেখেন, ‘অনতিবিলম্বে বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদের ভোটগ্রহণ স্থগিত করে পুনরায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে হবে। কেন্দ্র দখল করে নজিরবিহীন ভোট ডাকাতির নির্বাচন বাতিল করা না হলে বাঘাইছড়ি উপজেলায় যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য নির্বাচন কমিশন ও সরকারই দায়ী থাকবে।’

রাঙ্গামাটির প্রভাবশালী আঞ্চলিক দল ও সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) সমর্থিত চেয়ারম্যানপ্রার্থী হওয়া বড়ঋষি চাকমা কর্তৃক এমন হুঁশিয়ারির মাত্র ছয় ঘণ্টার মাথায় রাঙ্গামাটির ইতিহাসে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটলো। সচেতন মহল বলছে, রাঙ্গামাটিতে দীর্ঘদিন ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে থাকা পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এখন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ভাগ বসাচ্ছে লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজিতেও। গত ৩০ জুনের নির্বাচনে রাঙ্গামাটি সংসদীয় আসন হারিয়ে তারা এখন অনেকটাই কোণঠাসা। গত সোমবারের উপজেলা নির্বাচনে মাত্র দুটি উপজেলায় জয় পেয়েছে জেএসএস সমর্থিত প্রার্থীরা। বাকি আটটিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) সমর্থিতপ্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। অথচ ২০১৪ সালের নির্বাচনেও রাঙ্গামাটির ছয় উপজেলায় জেএসএসের চেয়ারম্যানপ্রার্থীরা জয় পেয়েছিলেন। এসব কারণে একের পর এক ঘাঁটি হারানোয় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে উপজাতীয় অস্ত্রধারী দলটি।

এ বিষয়ে জানতে গত দুদিন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতাদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। তবে সংগঠনটির বাঘাইছড়ি উপজেলা কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিব চাকমা বলেন, ‘ওই ঘটনার সঙ্গে আমাদের দূরতম সম্পর্কও নেই। কারণ ওই এলাকায় আমাদের কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম বা অবস্থান নেই। সিটি পুরোটাই ইউপিডিএফের নিয়ন্ত্রিত এলাকা। আমরা যেহেতু সকালেই নির্বাচন বর্জন করেছি এবং লিখিতভাবে আমাদের অভিযোগ নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছি, আমরা কেন এমন কাজ করব? আমরা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী; গণতান্ত্রিক আন্দোলনেই আমাদের আস্থা।’
স্থানীয় সূত্র জানায়, পাহাড়ি দলগুলোর দাপটে বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাচনে জাতীয় কোনো রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করতে পারেনি। সেখানে ভোটযুদ্ধে অংশ নেয় সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএসর প্রভাবশালী নেতা ও বর্তমান চেয়ারম্যান বড়ঋষি চাকমা এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) অন্যতম শীর্ষ নেতা সুদর্শন চাকমা।

দুই আঞ্চলিক দলের শীর্ষ ওই দুই নেতার ভোটযুদ্ধ নিয়ে এলাকায় যথেষ্ট টেনশন ছিল। ভোটের প্রচারণার মধ্যেই গত ৩ মার্চ উপজেলার বঙ্গলতলিতে হামলায় নিহত হন জনসংহতি সমিতির গুরুত্বপূর্ণ নেতা উদয় জয় চাকমা চিক্কোধন। ১৫ মার্চ খাগড়াছড়ির পানছড়িতে দুর্বৃত্তের গুলিতে বিনাশন চাকমা নামে এক ইউপিডিএফ কর্মী নিহত হন। সাংগঠনিক কাজে গণসংযোগের সময় জেএসএস সদস্যরা তাকে গুলি করে হত্যা করে বলে অভিযোগ ইউপিডিএফ’র।

এক হিসাবে দেখা গেছে, ২০১৭ সালের ২ ডিসেম্বর জেএসএস’র সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার (সন্তু লারমা) সেই ঘোষণার পর পাহাড়ে গত ১৫ মাসে ৬৩ জন পাহাড়ি-বাঙালি প্রাণ হারিয়েছেন।

এর মধ্যে দুজন পাহাড়ে আঞ্চলিক রাজনীতির শীর্ষ নেতা। এদের একজন হলেন শক্তিমান চাকমা, যিনি বাংলাদেশ সরকার ও জনসংহতি সমিতির প্রধান মধ্যস্থতাকারী ছিলেন। গতকাল সোমবার মারা যান দুই নির্বাচন কর্মকর্তাসহ সাতজন।

সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর পাহাড়ের বুকে শুরু হয় নতুন এক কালো অধ্যায়। ওইদিন নানিয়ারচর সতেরোমাইল এলাকায় চিরঞ্জীব দোজরপাড়া এলাকার নিজ বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় ইউপিডিএফ সমর্থক ইউপি সদস্য অনাধি রঞ্জন চাকমাকে (৫৫)। ওই হত্যার জন্য ইউপিডিএফ তাদেরই একসময়ের সামরিক কমান্ডার তপনজ্যোতি চাকমা বর্মার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ইউপিডিএফকে (গণতান্ত্রিক) দায়ী করে।

একই দিন রাঙ্গামাটির জুরাছড়িতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দ চাকমাকে (৪৪) গুলি করে হত্যা করা হয়। আওয়ামী লীগ ওই হত্যাকাণ্ডের জন্য সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতিকে (জেএসএস) দায়ী করেছে। একই সময় রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রাসেল মার্মাকে (৩২) কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে জেএসএস’র কর্মীরা।

একদিন পর ৭ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটি শহরে জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভানেত্রী ঝর্ণা খিসার বাসায় হামলা করে তাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে জেএসএসের সন্ত্রাসীরা। ওই ঘটনার ১০ দিনের মাথায় ১৬ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার বন্দুকভাঙ্গায় ইউপিডিএফ কর্মী ও সংগঠক অনল বিকাশ চাকমাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। ইউপিডিএফ ওই হত্যাকাণ্ডের জন্য ইউপিডিএফকে (গণতান্ত্রিক) দায়ী করে আসছে।

গত ৩ জানুয়ারি খাগড়াছড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয় ইউপিডিএফের অন্যতম নেতা মিঠুন চাকমাকে। ইউপিডিএফ ওই হত্যার জন্য ইউপিডিএফকে (গণতান্ত্রিক) দায়ী করেছে। একই দিন রাঙ্গামাটি বিলাইছড়ি উপজেলায় যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিশাল তংচঙ্গ্যার ওপর গুলি চালানো হলেও প্রাণে বেঁচে যান তিনি। এ ঘটনার জন্য যুবলীগ জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করে।

গত বছর রাঙ্গামাটিতে শক্তিমান চাকমার শেষকৃত্যে যোগ দিতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হন পাঁচজন। ওই ঘটনার পর আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতাদের ওপর হামলার প্রতিবাদে রাঙ্গামাটিতে সন্ত্রাসবিরোধী মহাসমাবেশের ডাক দেয় জেলা আওয়ামী লীগ। ৩০ জানুয়ারি সন্ত্রাসবিরোধী মহাসমাবেশে অংশ নেয়ায় বিলাইছড়িতে আওয়ামী লীগের তিন কর্মীকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করা হয়। এ ঘটনার জন্যও সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করেছিল আওয়ামী লীগ। ওই ঘটনার রেশ না কাটতেই ১২ ফেব্রুয়ারি রাঙ্গামাটি শহরে ছাত্রলীগ নেতা সুপায়ন চাকমাকে মারধর করে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কর্মীরা। প্রতিবাদে রাঙ্গামাটিতে হরতাল পালন করে জেলা ছাত্রলীগ।

মাঝখানে কিছুদিন বিরতি দিয়ে পাহাড়ে আবারও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের শুরু হয় ২০১৮ সালের ৩ মে। নানিয়ারচর উপজেলায় নিজ কার্যালয়ের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় উপজেলা চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএনলারমা) অন্যতম শীর্ষ নেতা শক্তিমান চাকমাকে।

ওই ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৪ মে দুপুরে শক্তিমান চাকমার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে যাওয়ার পথে সশস্ত্র হামলায় নিহত হন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক) শীর্ষ নেতা তপন জ্যোতি চাকমা বর্মাসহ পাঁচজন।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.