অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৮ই রমযান, ১৪৪০ হিজরী

বাঁচার জন্য হাসপাতালে এসেও সংকটাপন্ন জীবন

Print

দৈনিক চিত্র প্রতিবেদক:
‌চারদিকে হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচি, আগুন, আগুন। বাইরে এসে দেখি ধোঁয়া, উপরে আগুন। কিছু ভাবারই সময় পাইনি। রোগী নিয়ে সোজা খোলা আকাশের নিচে। বাঁচার জন্য হাপসাতালে এসেও রেহাই নেই। কোথায় নিরাপদ জানি না।’

এভাবেই দৈনিক চিত্রের কাছে নিজের অভিব্যক্তি জানান সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৮নং ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রোগী উর্মির বাবা বাবুল ফকির। আগুন লাগার আতঙ্কে তিনিও মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালের বাইরে বেরিয়ে আসেন। বরিশাল থেকে গত রোববার মেয়ে উর্মিকে নিয়ে ঢাকায় আসেন বাবা বাবুল ফকির। ভর্তি করান সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আগামী শনিবার উর্মির গলায় অপারেশন হবার কথা ছিল। কিন্তু এখন সেসব ভাবার সুযোগ নেই বাবুল ফকিরের।

দৈনিক চিত্রকে তিনি বলেন, ‘আগুনের ভয়ে হাসপাতালের বাইরে এসেছি। আগুন এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। খোলা আকাশের নিচে তো রোগীকে নিয়ে থাকা যায় না। অন্য কোনো হাসপাতালে যাব, এখানে আর নয়।’

হাসপাতালের ১নং ওয়ার্ডের ৮৫নং সিটের রোগী ঢাকা উদ্যানের আব্দুল গণি খাঁ। তার স্ত্রী ফাতেমা বেগম বলেন, ‘এখানে স্বামীকে বাঁচানোর আশায় ভর্তি করেছিলাম। কিন্তু এখন উল্টো মরার দশা। প্রথমে নার্সরা বলছিল, আগুন নিভে যাবে। কিন্তু শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি স্বামীর আগুনের ধোঁয়ায় আরও খারাপ অবস্থা। তাই আর ঝুঁকি নেইনি, বেরিয়ে এসেছি।’

ব্রেইন স্ট্রোকের পর বাবা আব্দুল আলেককে নেত্রকোনা থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন ছেলে জহুরুল ইসলাম। গত ৭ ফেব্রুয়ারি ভর্তি করেন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। ১নং ওয়ার্ডের ১৫নং বেডে জায়গাও হয়। কিন্তু বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা ৫৫ মিনিটে ধোঁয়া দেখে আর আগুনের খবরে রোগীকে নিয়ে ওয়ার্ড ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। এখন কী করবেন, কোথায় যাবেন; কোনো দিশা পাচ্ছেন না। ৫নং ওয়ার্ডের রোগী মজনু মিয়া। ব্রেইন স্ট্রোকের পর কিশোরগঞ্জের তাড়াইল থেকে এখানে আসেন। তার নাতি রানা কান্না জড়িত কণ্ঠে জানান, জীবন সংকটাপন্ন তার। একটা অ্যাম্বুলেন্স ম্যানেজ করেছি, কিন্তু অক্সিজেন নেই। আর বুঝি নানাকে বাঁচাতে পারব না। শেষ চেষ্টায় কুর্মিটোলা যাচ্ছি। বাকিটা আল্লাহ ভরসা।

ক্ষোভের সঙ্গে রোগী জাকিয়া বেগমের স্বজন শারমিন বেগম বলেন, শ্বাসকষ্ট নিয়ে মাকে মেডিসিন বিভাগের ৪নং ওয়ার্ডে ভর্তি করেছিলাম। কিন্তু আগুনের ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট আরও বেড়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে না আসায় হাসপাতালেও থাকা হলো না। ‘মায়ের বাঁচা-মরা আল্লাহর হাতে। এত বড় হাসপাতাল, কিন্তু অগ্নিনির্বাপণের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। রোগী-স্বজনদের আহাজারি আজ মৃত্যুর সমান। এটা মানা যায় না। মাকে বাঁচাতে এসে নিজেরও মরার দশা।’

প্রসঙ্গত, সন্ধ্যা ৬টার দিকে হাসপাতালের নতুন ভবনে স্টোর রুম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ছয়টি ইউনিট প্রথমে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। পর্যায়ক্রমে ইউনিট বাড়িয়ে ১৬টি করা হয়।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল আংশিক চালু:
সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল আংশিকভাবে চালু করা হয়েছে। হাসপাতালের মাঠে রাখা রোগীদের ভবনে তোলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ১০টার দিকে হাসপাতাল চালুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ। এর আগে বিকাল ৫টা ৫০ মিনিটে লাগা ওই আগুন ফায়ার সার্ভিসের ১৬টি ইউনিটের চেষ্টায় রাত ৮টা ২০ মিনিটে নিয়ন্ত্রণে আসে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক বলেন, ‘ঘটনাস্থল তৃতীয় তলার কয়েকটি ওয়ার্ড বাদে অন্যান্য ওয়ার্ডে চিকিৎসাসেবা রাতেই চালু হচ্ছে। ইতোমধ্যে জরুরি বিভাগ খুলে দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের মাঠে অবস্থান করা রোগীদের ভবনে তোলা হয়েছে। আগুন লাগার পর এই হাসপাতাল থেকে যে ১১শ’র মতো রোগীকে আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে তারা চাইলে এখন হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিতে পারেন। আর যদি তারা সেখানে থেকেই চিকিৎসা নিতে চান তাও পারেন। আমাদের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।’

আবুল কালাম আজাদ আরও বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদফতরের আহ্বানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স ফ্রিতে নিয়ে রোগীদের অন্যান্য হাসপাতালে স্থানান্তরিত করেন।’




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.