অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ১০ই বৈশাখ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ৫ই শাবান, ১৪৩৯ হিজরী

বাঙালি প্রাণে বৈশাখী দোলা

Print


নিজস্ব প্রতিবেদক :
“হে নতুন এসো তুমি- সম্পূর্ণ গগণ পূর্ণ করে, ব্যর্থতার গøানি ভুলে, ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা, পুড়িয়ে ফেলে বাজুক, প্রাণে প্রাণে মঙ্গল বারতা”। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর সৃষ্টি ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো, তাপস নিঃশ্বাস বায়ে, মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে, বছরের আবর্জনা, দূর হয়ে যাক-যাক, এসো এসো’। কবিগুরুর সাথে সুর মিলিয়ে বিশ্বের সকল বাঙালি আজ স্বাগত জানাবে শুভ বাংলা বর্ষ ‘১৪২৫’কে। আজ বাংলা বছরের প্রথমদিনে নানা আয়োজনে বিশ্ববাঙালি উদযাপন করবে বর্ষবরণের বর্ণাঢ্য উৎসব, বাঙালিজীবনের প্রাণের উৎসব, বাঙালি সংস্কৃতিতে স্নাত হওয়ার উৎসব। অসা¤প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ সকল শ্রেণি-পেশার সব বয়সি মানুষের মনের গভীরে দারুণভাবে রেখাপাত করে আজকের এ দিনটি। শুধু বাঙালিই নয়, বাংলা ভাষাভাষী আদিবাসী ও নৃ-জনগোষ্ঠী, ধর্র্মবর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের জীবন জগতের স্বপ্নময় নতুন বছরের শুভযাত্রা সূচিত হয় এ বৈশাখে।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের ভাষায়Ñ ‘নতুনের কেতন ওড়ে এ বৈশাখে, তাই তিনি সবাইকে নতুনের জয়ধ্বনি করার আহŸান জানান। বৈশাখের এ প্রথম দিবসটি আবহমানকাল থেকেই বাঙালির সত্তায়, চেতনায় ও অনুভবের জগতে এক গভীরতর মধুর সম্পর্ক নিয়ে বিরাজ করছে। পহেলা বৈশাখ পুরনো জীর্ণকে ঝেড়ে ফেলে বাঙালিদের যাপিত জীবনে নতুন সম্ভাবনা আর নতুন প্রত্যাশা জাগিয়ে তুলতেই শুধু নয়, সকল ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে এবং সা¤প্রদায়িক স¤প্রীতিতে একাকার হওয়ার প্রেরণাও জোগায়। তাই পহেলা বৈশাখই হচ্ছে বাঙালিজীবনের সবচেয়ে বড় অসা¤প্রদায়িক, সর্বজনীন ও আবহমান উৎসব। বাংলা ও বাঙালির লোকজ সংস্কৃতির মূল বিষয়টি হলোÑ “উৎসবের মধ্য দিয়ে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ”।
এ উৎসবের মধ্য দিয়েই প্রকাশ ঘটে, বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, গৌরব আর সংস্কৃতির। বাঙালির চৈত্র সংক্রান্তির ইতিহাস প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরনো হলেও বাংলা সন বা পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ইতিহাস বেশি প্রাচীন নয়। মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে কৃষকের ফসল কাটার মৌসুমে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্যে বাংলা সনের প্রবর্তন হয়। তিনি তৎকালীন বাংলার কৃষক সমাজের ফসল ঘরে তোলার সময়টাকেই গুরুত্ব দিয়ে হিজরি সন এবং শতাব্দের সঙ্গে সৌর সন তথা খ্রিস্টাব্দের সমম্বয় করে বঙ্গাব্দের প্রবর্তন করেন। ওই সময় আজকের এ বাংলা সনকে বলা হতো ফসলি সন। এতে মোগল সম্রাটদের খাজনা আদায়ের সুবিধার পাশাপাশি বাঙালি জাতি পেয়ে যায় নিজস্ব বাংলা বর্ষপঞ্জি। পরবর্তী সময়ে চন্দ্রমাস অনুযায়ী হিজরি সন বা প্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ইংরেজি সনসহ নানা হিসাব-নিকাশ করে ৪৬১ বছর যাবৎ ইংরেজি বর্ষের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ধারা সূচিত হয়। বাংলা নববর্ষ উদযাপনে পাকিস্তান আমলে বাঙালির এ প্রাণের উৎসবে রবীন্দ্রসঙ্গীতচর্চাকে হিন্দুয়ানি ও মুসলিম বিদ্বেষী বলে প্রচার চালিয়ে ছিলো। এমনকি বেতার-টেলিভিশন ও সকল অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়। সে সময় শুধু ঘরোয়া অনুষ্ঠান ছাড়া আর কোথাও রবীন্দ্রনাথের গান শোনা যেতো না। সুস্থ সংস্কৃতিচর্চার এমনই এক শোচনীয় ও কঠিন মুহূর্তে সে সময়কার সাহসী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ওয়াহিদুল হক ও সানজিদা খাতুনের নেতৃত্বে কয়েকজন সাংস্কৃতিককর্মী মিলে ইংরেজি ১৯৬৭, বাংলা ১৩৭৪ সনের পহেলা বৈশাখ ঢাকার রমনা বটমূলে প্রথম ছায়ানটের বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। পাকিস্তানি সামরিক শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ছায়ানট সেই যে শুরু করেছিলো পহেলা বৈশাখে সূর্যোদয়ের আগমনী সঙ্গীতÑ “এসো হে বৈশাখ এসো এসো” তা ৫১ বছর ধরে আজও বহমান। রাজধানীতে পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের গানের মাধ্যমে নতুন বছরের সূর্যকে আহবান। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে রমনার বটমূলে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানান।
আজ দেশ-মা ও মাটির গন্ধে পহেলা বৈশাখ আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি অন্যতম স্তম্ভ। এ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই আমাদের শুধু ঐক্যবদ্ধই করে নাÑ বিশ্বে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করছে। মানুষকে কাছে রাখার সেতুবন্ধন হয়ে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে আসন করে নিয়েছে এদিনটি। বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান এখন ফুলে-ফলে, পত্র-পল্লবে বিকশিত হয়ে রাজধানীকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলার গ্রামগঞ্জ পেরিয়ে বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে বাঙালিপ্রাণের সর্বজনীন এ বৈশাখী উৎসব। বর্ষবরণ উৎসবের প্রধান আকর্ষণ, বর্ণাঢ্য “মঙ্গল শোভাযাত্রা” এখন বাংলার প্রতিপ্রান্তরে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এখানেও নানা পোশাকে, বিভিন্ন ধরনের বাঙালি কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি বৈশাখী মেলা, বিভিন্ন রকম খেলাধুলা, বউ মেলা, ঘোড়দৌড় এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পান্তা ইলিশসহ বিভিন্ন ধরনের মুখরোচক খাবারের আনন্দে মেতে ওঠে পুরো বাঙালি জাতি। এ দিনের আরেকটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। এর মধ্যে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা কিংবা কুস্তি একসময় প্রচলিত ছিল। বাংলাদেশে এরকম কুস্তির সবচেয়ে বড় আসরটি হয় চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে ১২ বৈশাখ, যা জব্বারের বলি খেলা নামে পরিচিত। এমনিকরেই হাজার বছরের বাঙালির বৈশাখী উৎসব চলছে এবং চলবে অনন্তকাল। আজ নববর্ষের সুন্দর সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে সবচেয়ে বড় ও আকর্ষণীয় মঙ্গল শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হবে।




মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.