অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ৫ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৮ই জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী

বাণিজ্যমেলায় ২শ’ কোটি টাকার রফতানি আদেশ

Print

দৈনিক চিত্র প্রতিবেদক:
২৪তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় গত এক মাসে দর্শনার্থীর উপস্থিতি অর্ধকোটি পার হয়েছে এবং এ মেলায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রফতানি অর্ডার পেয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকার। যা গত বছরের চেয়ে এ বছর রফতানি আদেশ বেড়েছে ৩৫ কোটি টাকা।

শনিবার বাণিজ্যমেলায় সমাপনী অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এসব তথ্য জানান। একই সঙ্গে মন্ত্রী জানান, ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা পূর্বাচলে করার যে আয়োজন চলছে সেখানে করা সম্ভব নয় বলেও পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন। আগারগাঁওয়ে বাণিজ্যমেলা প্রাঙ্গণে সমাপনী অনুষ্ঠানে এ সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি তোফায়েল আহমেদ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব এস এম রেজওয়ান হোসেন এবং রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান বিজয় ভট্টাচার্যসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রপতি এক মাস আগে এই মেলার উদ্বোধন করেছিলেন। আজকে (শনিবার) আমাকে যা বলা হয়েছে এবং খোঁজ নিয়েছি, তাতে অত্যন্ত সফলভাবেই শেষ হয়েছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় বিক্রি ভাল হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এ মেলায় মানুষের উপস্থিতি প্রায় অর্ধকোটি পার হয়েছে। আর বেচাকেনাও ভাল হয়েছে। আর বিদেশের রফতানি অর্ডারও পেয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। তো সব বিবেচনাতেই যা খবর, তাতে আমরা দেখেছি যে, এবারের মেলাটা খুব সফল হয়েছে। আগে থেকে ভাল হতে হতে এটা বাড়ছে। গত বছর ২৩তম আসরে ১৬৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকার রফতানি আদেশ পেয়েছিল। তার আগের বছর ২২তম আসরে মেলায় ২৪৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বা ৩০ দশমিক ৪৩ মিলিয়ন ডলারের স্পট অর্ডার এসেছিল। আর এ বছর বাংলাদেশী কোম্পানিগুলো প্রায় ২০০ কোটি টাকা রফতানি আদেশ পেয়েছে।

এদিকে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পশ্চিম পাশের মাঠ থেকে বাণিজ্যমেলা সরিয়ে নেয়ার জন্য ২০১৫ সালে ‘বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টার কমপ্লেক্স’ (বিসিএফইসি) নামের চীনের সহায়তায় ৭৯৬ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। প্রকল্পটি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ব্রাহ্মণখালীর বাগরাইয়াটেকে (পূর্বাচল) বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রকল্পটি ২০২০ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। শত কোটি টাকার প্রকল্প শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে সম্প্রতি দায়িত্ব নেয়া বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলছেন, বাণিজ্যমেলা পূর্বাচলে করা সম্ভব নয়।

সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এ বিষয়ে বলেন, আমাদের মেলার চাহিদা যেভাবে বাড়ছে, এখানে (শেরেবাংলা নগরের) অপ্রতুল আমাদের জন্য। মেলা করতে হিমশিম খেতে হয়। অনেকের ধারণা, আমরা পূর্বাচলের দিকে যেটা করছি, সেটা এ রকম বাণিজ্যমেলা হবে কি-না। সেটা সম্ভবত হবে না। এখানে ৩৬ একরের ওপরে আমাদের জায়গা, তারপরও সংকুলান হয় না। আগামীতে পূর্বাচলে ৩০ একর জায়গায় এ মেলা আয়োজন করা সম্ভব কি-না, তা এখন থেকেই ভাবতে হবে। আগামী ১০ থেকে ১৫ বছর পর মেলার চাহিদা আরও বাড়বে। কারণ পূর্বাচলে ৩০ একর জায়গা এ মেলার জন্য অপ্রতুল। তবে সেখানে সারা বছর অন্যান্য মেলা চলবে। সম্ভবত ওখানে (পূর্বাচলে) সারা বছর ধরেই বিভিন্ন এক্সপোর্ট, মেলা বা শো, বিভিন্ন অর্গানে ফুড প্রডাকশন নিয়ে আসবে। বাইরের ওরাও (বিদেশীরা) আসতে পারে। এসে আমাদের এখানে ওই ধরনের এক্সপোর্ট ফেয়ার করতে পারবে। এ ধরনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা সেখানে আয়োজন করা যাবে না। তাই এখন থেকে আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে। টিপু মুনশি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয়েছে, এখনই এই জায়গা অপ্রতুল। তাহলে ১০ থেকে ২০ বছর পরে কোথায় হবে বাণিজ্যমেলা। সেটাও কিন্তু এখনই চিসবতা করার সময় এসেছে। আমাদের সরকারী কর্মকর্তারা রয়েছেন, আপনারা কিন্তু এই ব্যাপারটা দেখবেন। আমি জানতে চেষ্টা করব, কী করা যায় সামনের দিনগুলোতে।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এবারের মেলায় সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো আমাদের দেশি পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। বায়াররা আমাদের পণ্যে আকৃষ্ট হচ্ছে। সম্প্রতি চামড়া রফতানি কমেছে জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা যদি আগাতে চাই, তাহলে আমাদের রফতানি বাড়াতেই হবে। এ ক্ষেত্রে শুধু গার্মেন্টসের ওপর নির্ভর না করে আরও অন্যান্য প্রোডাকশনে যাওয়া উচিত। আমাদের কিন্তু সম্প্রতি লেদার এক্সপোর্ট কমে গেছে। যার জন্য কিছু সমস্যাও আছে। আবার কিছু পণ্যের রফতানি বাড়াতে হবে।

অনুষ্ঠানে তোফায়েল আহমেদ বলেন, পূর্বাচলের জমিতে চায়না কোম্পানি বাণিজ্যমেলার স্থায়ী জায়গায় নির্মাণ কাজ করছে। হয়তো একটু সময় লাগবে। এবারের মেলায় রফতানি আদেশ ভাল হয়েছে। গতবার আমাদের রফতানি হয়েছিল ৪১ বিলিয়ন ডলার। এবার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৫ বিলিয়ন ডলার। ২০৪১ সালে আমাদের রফতানি হবে ৬০ বিলিয়ন ডলার। সবক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভাল করছে। তিনি আরও বলেন, গত ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ প্রমাণ করে দিয়েছে তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। তাই এখন অনেক ভাল লাগে যখন সংসদে দেখি কোন যুদ্ধাপরাধী নেই, কোন খুনি নেই। আমরা সবাইকে সঙ্গে নিয়েই সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। ব্যবসার ক্ষেত্রে আমাদের সমস্যাগুলো একসঙ্গে বসে সুন্দরভাবে সমাধান করতে সরকার আন্তরিক।

মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব রেজওয়ান হোসেন বলেন, এবার মেলায় অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা বেড়েছে। আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভিশন ২০২১, ২০৪১ ও ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন করা। এজন্য আমাদের ব্যবসা বাড়াতে হবে। আর ব্যবসা বাড়াতে পণ্যের মানের পাশাপাশি সেবার মান বাড়াতে হবে। এখন অনেক কোম্পানিই আসছে যারা সেবাগ্রহণ করতে চাচ্ছে। আশা করি, আমরা সেবা রফতানির ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্য স্তরে পৌঁছাতে পারব। এক্ষেত্রে বাণিজ্যমেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান বিজয় ভট্টাচার্য বলেন, মেলায় এবারই প্রথম অনলাইনে টিকেট বিক্রি করা হয়। এতে বেশ ভাল সাড়া পাওয়া গেছে। মেলায় আসা ক্রেতা-দর্শনার্থীদের জন্য ৫টি বিশ্রামাগার ও প্রতিবন্ধীদের জন্য হুইল চেয়ার ছিল।

এদিকে এবারের মেলায় অংশ নেয়া ৬০৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সেরা ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কার দিয়েছে ইপিবি। অনুষ্ঠানেই বিজয়ীদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেয়া হয়। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সেরাদের গোল্ড কালার্ড ট্রফি এবং বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে দ্বিতীয়, তৃতীয় স্থান অধিকারীদের মাঝে সিলভার ট্রফি ও ব্রাস ট্রফি দেয়া হয়। এছাড়া ভ্যাট প্রদানকে উৎসাহিত করতে মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে তিন প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ ভ্যাট প্রদানকারী হিসেবে ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো-হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড, ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড এবং এসকোয়ার ইলেক্ট্রনিক্স লিমিটেড।

মেলায় অনন্য সম্মাননা পুরস্কার পেয়েছে কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড। সেরা প্রিমিয়ার প্যাভিলিয়ন ও সেরা সাধারণ প্যাভিলিয়নে প্রথম হয়েছে ওয়াল্টন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। সেরা সংরক্ষিত প্যাভিলিয়নে প্রথম হয়েছে জুট ডাভার্সিফিকেশন প্রোমোশন সেন্টার (জেডিপিসি)। এবার বিদেশী প্যাভিলিয়ন ক্যাটাগরিতে যৌথভাবে প্রথম হয়েছে জাপানের হালাল কোম্পানি লিমিটেড এবং তুরস্কের হাডেক্স হালি ডেরি টেক্সটাইল ডাইস টিআইসি এ এস। সেরা প্রিমিয়ার মিনি প্যাভিলিয়নে বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, সেরা সাধারণ মিনি প্যাভিলিয়নে বঙ্গ মিলার্স লিমিটেড, সেরা সংরক্ষিত মিনি প্যাভিলিয়নে বাংলাদেশ পোস্ট অফিস, সেরা প্রিমিয়ার স্টলে এম/এস হেলাল ও ব্রাদ্রার্স এবং সেরা সাধারণ স্টলে প্রথম হয়েছে ফরচুন টেক লিমিটেড।

এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা ইউনেস্কো অটিজম কমিটির বিশেষ দূত সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের অনুপ্রেরণায় মেলার অভ্যন্তরে বিনোদন কেন্দ্র শারিকা ফ্যান্টাসি এমাজিং ওয়ার্ল্ডের কর্ণধার ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সহ-সভাপতি মুহম্মদ মাহবুবুর রহমান পলাশের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেয়া হয়। অটিস্টিক শিশুদের বিনামূল্যে বিনোদন দেয়ার জন্য চতুর্থবার এই সম্মাননা ক্রেস্ট পেল। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতি তোফায়েল আহমেদ মানবিক কাজের প্রশংসা করে ভবিষ্যতেও এ ধরনের কাজ করার আহ্বান জানান।

এবারের মেলায় প্যাভিলিয়ন ছিল ১১০টি, মিনি-প্যাভিলিয়ন ছিল ৮৩টি ও রেস্তরাঁসহ অন্যান্য স্টল ছিল ৪১২টি। বাংলাদেশ ছাড়াও ২২টি দেশের ৫২টি প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নেয়।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.