অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ৯ই রমযান, ১৪৩৯ হিজরী

রাখাইনে হঠাৎ বৃষ্টির মতো গুলি, গণকবরে ৪০০ লাশ

Print

অনলাইন ডেস্ক : রাখাইন অঞ্চলের গুদারপিন গ্রামে যখন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অভিযান চালায়, তখন নূর কাদির এবং তার আরো ১৪ জন বন্ধু একটি ফুটবল টিমের জন্য খেলোয়াড় বাছাই করছিলেন। টিনের চালে বৃষ্টি হলে যে ধরনের শব্দ হয়, ঠিক ওইরকম গুলির আওয়াজ শুরু হওয়ার পর সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। নূর কাদির এবং দুই বন্ধু সেখান থেকে কোনো রকমে বেঁচে যান। এর কয়েকদিন পর নূর কাদির দুটি কবরে তার ছয়জন বন্ধুর মৃতদেহ আবিষ্কার করেন। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস বলছে, নূর কাদিরের মতো এ ধরনের বর্ণনা আরো অনেক রোহিঙ্গার কাছ থেকে তারা শুনেছে।
এপি জানিয়েছে, মিয়ানমারে নতুন করে কিছু গণকবরের প্রমাণ তাদের হাতে এসেছে। তারা যেসব তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে তাতে মনে হচ্ছে গত আগস্টে সেনাবাহিনীর অভিযানে রাখাইন রাজ্যের গুদারপিন গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে। এপির ভাষ্য অনুযায়ী, স্যাটেলাইটে পাওয়া চিত্রের সাথে এবং বাংলাদেশের কক্সবাজার ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের বর্ণনা মিলে যাচ্ছে। স্যাটেলাইটের চিত্র এবং রোহিঙ্গাদের ভাষ্য অনুযায়ী অন্তত পাঁচটি গণকবরের সন্ধান মিলেছে। এসব গণকবরে ৪শর মতো মানুষকে চাপা দেয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন রোহিঙ্গা যুবক নূর কাদির। তিনি গণকবরে তার বন্ধুকে চিহ্নিত করেছেন। তবে নূর কাদিরের বন্ধুর চেহারা বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। তার মুখের একটি অংশ অ্যাসিডে দগ্ধ এবং বুলেটবিদ্ধ। বন্ধুর কাপড় দেখে তাকে চিনতে পারেন তিনি। নূর কাদির বলেন, কবরের ভেতরে মৃতদেহগুলোকে স্তূপ করে রাখা হয়েছিল। যে গ্রামটির কথা বলা হচ্ছে, সেখানে কাউকে প্রবেশ করতে দেয় না মিয়ানমার সরকার। সুতরাং ঐ গ্রামে আসলে ঠিক কতজন মারা গেছে, তা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস বলছে, তারা ঐ গ্রামের স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া কিছু ছবি সংগ্রহ করেছে। বাড়িঘর পুড়িয়ে দেবার কিছু ভিডিও-ও তাদের হাতে এসেছে।
কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসরত নেতৃস্থানীয় রোহিঙ্গারা ৭৫ জনের মৃত্যুর তথ্য একত্রিত করেছে। গ্রামবাসীরা বলছে, মৃতের সংখ্যা প্রায় ৪শর মতো হবে। যারা মারা গেছেন তাদের পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এবং সরাসরি মৃতদেহ দেখার ওপর ভিত্তি করে তারা এসব কথা বলছেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস বলেছে, বাংলাদেশে অবস্থানরত যেসব রোহিঙ্গার সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে, তাদের প্রায় সবাই বলেছেন যে গুদারপিন গ্রামের উত্তরদিকে যে প্রবেশপথ রয়েছে, সেখানে তারা তিনটি বড় গণকবর দেখেছেন। ওই জায়গায় অধিকাংশ রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। অল্পসংখ্যক রোহিঙ্গা জানিয়েছেন, পাহাড়ের কাছে একটি কবরস্থানে তারা দুটি কবর দেখেছেন।
জায়গাটি গ্রামের একটি স্কুলের কাছাকাছি। গ্রামে হত্যাকাÐ চালানোর পর ১শর বেশি সৈন্য ওই স্কুলে তাদের ঘাঁটি গেড়েছিল। ওই গ্রাম থেকে যেসব রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে জীবন বাঁচিয়েছেন তাদের ধারণা আগস্ট মাসের ২৭ তারিখের হত্যাকাÐ ছিল বেশ পরিকল্পিত। হত্যাকাÐ চালানোর জন্য সৈন্যরা শুধুই রাইফেল, ছুরি, গ্রেনেড এবং রকেট লঞ্চার আনেনিÑ সাথে অ্যাসিডও নিয়ে এসেছিল তারা। অ্যাসিড দিয়ে নিহতদের মুখমÐল এবং শরীরের অংশ ঝলসে দেয়া হয়, যাতে তাদের চিহ্নিত করা না যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০০ সৈন্য ওই হত্যাযজ্ঞে অংশ নিয়েছিল। হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে গেছেন ২৩-বছর বয়সি মোহাম্মদ রইস। তিনি বলেন, মানুষজন তখন চিৎকার করছিল, সৈন্যদের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইছিল। এদিকে জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত ইয়াংহি লি বলেছেন, যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা গণহত্যার চিহ্ন। তিনি বলেন, গণহত্যার খবর অবশ্যই গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা উচিত।




মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.