অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ৩১শে শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ৩রা জিলহজ্জ, ১৪৩৯ হিজরী

রাশিয়ায় জ্ঞান অর্জন, চীনের প্রযুক্তি : ৫ ব্যাংকের কয়েক কোটি টাকা চুরি

Print

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাশিয়ায় জ্ঞান অর্জন এবং চীনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের সকল ব্যাংকের টাকা লুটের পরিকল্পনা করেছিলো প্রতারক শরিফুল। পরিকল্পনার শুরুতেই ৫টি ব্যাংক থেকে কয়েক কোটি টাকা লুট করে বিলাসবহুল জীবনযাপন শুরু করার মুহ‚র্তেই ধরা পড়ে ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)-এর কাছে।
শরীফুল প্রথমে বিশেষ মিনি কার্ড রিডারের মাধ্যমে গ্রাহকের এটিএম কার্ডের অভ্যন্তরীণ তথ্য স্ক্যান করে। এরপর ব্যাংকের গ্রাহক যখন পিন নম্বর দিতেন তখনে সুকৌশলে সেটিও টুকে চীনের তৈরি একটি ঘড়ির মাধ্যমে তা নিয়ে নিতো। পরে বিলের রি-প্রিন্ট দিয়ে ওই কপির পেছনে পিন নম্বরটি লিখে রাখতো। এভাবেই এটিএম কার্ডের তথ্য চুরি করতো প্রতারক শরিফুল ইসলাম। পাঁচটি ব্যাংকের কার্ড জালিয়াতি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগেই গত মঙ্গলবার সিআইডি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
বুধবার দুপুরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান। তিনি বলেন, ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইবিএল ব্যাংক, ইউসিবিএল বাংক ও ব্যাংক এশিয়াসহ পাঁচটি ব্যাংকের কার্ড জালিয়াতি করে অর্থ আত্মসাৎ করে শরিফুল। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মিরপুর এলাকায় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে তাকে গ্রেপ্তার করে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিট। এসময় তার কাছ থেকে একটি ল্যাপটপ, বিভিন্ন ব্যাংকের ১ হাজার ৪০০টি ক্লোন কার্ড, একটি ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ কার্ড রিডার ও রাইটার, তিনটি পজ মেশিন, সচল ডিজিটাল হাতঘড়ি (গ্রাহকদের তথ্য চুরিতে ব্যবহৃত), দুটি মিনি কার্ড রিডার ডিভাইস, ১৪টি পাসপোর্ট, আটটি মোবাইল ফোনসেট, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের একটি নেক্সাস ক্রেডিট কার্ড, একটি পরচুলা, একটি কালো রঙের সানগøাস ও তিনটি এনআইডি কার্ড উদ্ধার করা হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘মার্চ ২০১৮-এর দ্বিতীয় সপ্তাহে সংঘটিত পাঁচটি (ব্র্যাক ব্যাংক, সিটিব্যাংক, ইবিএল ব্যাংক, ইউসিবিএল ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া) ব্যাংকের কার্ড জালিয়াতি ঘটনার অভিযোগ পাওয়া যায়। এরপর ওই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করা হয়। তদন্তে আমরা জানতে পারি, ব্যাংকের গ্রাহকরা বিভিন্ন সুপার শপ ও ডিপার্টমেন্ট স্টোর থেকে পণ্য কেনার পর কার্ড পাঞ্চ করার সময় একটি চক্র সুকৌশলে গ্রাহকদের তথ্য চুরি করে ক্লোন কার্ড তৈরি করে। এসব ক্লোন কার্ড দিয়ে এটিএম বুথ থেকে টাকা চুরি করে নিচ্ছে। সেই অভিযোগে আসামি শরিফুলকে মিরপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।’ তিনি বলেন, তদন্তে আমরা জানতে পারি, প্রতারক শরিফুল ইসলাম ডিপার্টমেন্টাল শপ স্বপ্নের বনানী শাখায় কাজ করতো। তার হাতঘড়িতে থাকা বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইসের মাধ্যমে সে গ্রাহকদের এটিএম কার্ডের তথ্য চুরি করতো। এরপর শরীফুল বাসায় গিয়ে তার ল্যাপটপ এবং ডিভাইসের মাধ্যমে কাস্টমারের তথ্যগুলো ভার্জিন কার্ড বা খালি কার্ডে স্থাপন করে ক্লোন এটিএম কার্ড বানাতো। পরে যেকোনো এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে নিতো। বুথে টাকা তোলার সময় সিসি ক্যামেরায় যাতে তাকে চেনা না যায় সে জন্য প্রতারক শরিফুল পরচুলা এবং চশমা ব্যবহার করতো।
মোল্যা নজরুল বলেন, স্বপ্নতে চাকরি করলেও তার মূল পেশা ছিল ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি। এই জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ টাকায় সে বিলাসী জীবনযাপন করতো। সে ব্যক্তিগত চলাচলের জন্য টয়োটা এলিয়ন মডেলের গাড়ি ব্যবহার করে। আর তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পর্যালোচনা করে এ পর্যন্ত কয়েক কোটি টাকার সন্ধান পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তারকৃত শরীফুলকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, শরীফুলের বাবার নাম ইয়াজ উদ্দিন বিশ্বাস। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার হেমায়েতপুর গ্রামে তাদের বাড়ি। শরীফুল মেহেরপুর হাট বোয়ালীয়া উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০০১ সালে এসএসসি এবং গাংনী ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০০৩ সালে এইচএসসি পাস করে। উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য রাশিয়ার পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটিতে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে তিন বছর মেয়াদি ডিগ্রি নিতে যায়। ২০১০ সালে বাংলাদেশে ফেরত আসে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় তার রাশিয়ান রুমমেট ইভানোভিচের কাছ থেকে ক্রেডিট কার্ড প্রতারণার কৌশল শিখে শরিফুল। দেশে আসার পরপরই সে কার্ড জালিয়াতি শুরু করে।
গত ২০১৩ সালে এই সংক্রান্তে দুটি মামলা হয় এবং সেই মামলায় প্রতারক শরীফুল ১৮ মাস জেল খাটে। পরে সে কিছুদিনের জন্য স্টুডেন্ট কন্সালটেন্সি ফার্ম খোলে। কিন্তু সেখানে তেমন সুবিধা করতে না পেরে রুমমেটের কাছ থেকে শেখা কৌশল আবারো কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এ ব্যাপারে মানিলন্ডারিংয়ের মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সিআইডি সদর দপ্তরের সংবাদ সম্মেলনের সময় ব্র্যাক ব্যাংকের হেড অব কমিউনিকেশন অ্যান্ড সার্ভিস কোয়ালিটি জারা জাবীন মাহবুব উপস্থিত হয়ে বলেন, তারা কয়েকজন গ্রাহকের কাছ থেকে মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে জানতে পারেন যে, ব্যাংক থেকে কে বা কারা তাদের টাকা তুলে নিয়েছে এবং তারা আমাদের কাছে এ ব্যাপারে অভিযোগ দেন। এরপর বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখে তাদের ক্ষতিপূরণের টাকা ফেরত দেই। পরে আমরা বিষয়টি সিআইডিকে জানাই। তিনি আরও বলেন, গত মার্চ মাসেই এটিএম বুথ থেকে টাকা লুট সংক্রান্ত নয়টি অভিযোগ পাওয়া যায়।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেনÑ সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার রায়হান উদ্দীন খান, অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মিনহাজুল ইসলাম, অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আসলাম উদ্দিন, রফিকুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার নাজিম উদ্দিন, সহকারী পুলিশ সুপার সুমন কুমার দাস এবং সহকারী পুলিশ সুপার শারমিন জাহান।




মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.