অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ১২ই ফাল্গুন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৮ই জমাদিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী

সংসদে অবস্থান পরিষ্কার করার দাবি ১৪ দলীয় জোট শরীকদের

Print

দৈনিক চিত্র প্রতিবেদক:
জোট ও সরকারের মধ্যে সম্পর্কের অবমূল্যায়নে ক্ষোভ প্রকাশ করে সংসদে নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক নেতারা। তারা বলেছেন, সংসদে তারা সরকারী না বিরোধী দলে রয়েছেন সেটি এখনও স্পষ্ট করা হয়নি। এতে জনমনে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। ১৪ দলই যদি থাকে তাহলে তো আমাদের সংসদে ট্রেজারি বেঞ্চে বসার কথা। আর বিরোধীদলে বসতে হলে ১৪ দলে থাকা কেন?

বুধবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় ১৪ দলের বৈঠকে শরিক দলগুলোর নেতারা এমন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে বৈঠক সূত্রে দৈনিক চিত্রকে জানিয়েছে। গত ৭ জানুয়ারি টানা তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর এই ছিল কেন্দ্রীয় ১৪ দলের প্রথম বৈঠক। বৈঠকে শরিক জোটের নেতারা তাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহির্প্রকাশ ঘটনা।

বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে ১৪ দলের মুখপাত্র ও আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য ও খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ নাসিম এমপি বলেছেন, বৈঠকে অতীতের মতো আগামীতেও নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারকে সহযোগিতা ও একসঙ্গে কাজ করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ১৪ দল। যেসব লক্ষ্যকে সামনে রেখে ১৪ দল গঠিত হয়েছিল, সেগুলো এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়ায় ১৪ দলের প্রয়োজনীয়তা এখনও শেষ হয়ে যায়নি বলেও জোটের শরিক দলগুলো মনে করছে। তিনি আরও বলেন, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর নিস্তেজ সর্পের মতো আপতত ঘাপটি মেরে আছে বিএনপি-জামায়াত। তবে সময় মতো উঠে দাঁড়িয়ে তারা বিষাক্ত সাপের মতো ছোবল মারতে পারে। তাই সবার সজাগ থাকতে হবে। নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বিএনপি-জামায়াত দেশে-বিদেশে অপপ্রচার চালাচ্ছে, সক্রিয় আছে। তিনি বলেন, আদর্শ ও লক্ষ্যকে ধারণ করে ১৪ দল এগিয়ে যাচ্ছে। কোন পদ পদবি কিংবা লঘু কারণের জন্য ১৪ দল সংগঠিত হয়নি। যতদিন পর্যন্ত ১৪ দলের এই লক্ষ্য অর্জিত না হবে ততদিন পর্যন্ত ১৪ দল কাজ করে যাবে। ১৪ দল পাহাড়ের মতো ঐক্যবদ্ধ আছে। দুঃসময় ও সুসময়- সবসময়ই ১৪ দল শেখ হাসিনার পাশে আছে, থাকবে, চোখের মণির মতো তাঁকে রক্ষা করবে।

তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত স্বাধীনতাবিরোধী অশুভ শক্তি এখনও আছে এবং চক্রান্ত করে যাচ্ছে। তারা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর বিরুদ্ধে যেকোন সংগ্রাম ও লড়াইয়ে ১৪ দল প্রস্তুত থাকবে। আর বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রশ্নটি আইন ও আদালতের বিষয়। এর জন্য সরকারকে হুমকি-ধমকি দিয়ে লাভ নেই। তিনি এখন আর রাজনৈতিক ব্যক্তি নন, আদালতে দ-িত ব্যক্তি।

মোহাম্মদ নাসিম বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংসদে যোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়ে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, সংসদ বর্জন করে কেউ কোন সুফল পায়নি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির নির্বাচিতরাও সংসদে যোগ না দিয়ে কোন ভাল ফল পাবে না। তিনি বলেন, আপনারা যারা নির্বাচিত হয়েছেন সংসদে আসুন। কথা বলুন, সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করুন এবং সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিন। তাহলে দেশ ও গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গলজনক হবে। সভায় বঙ্গবন্ধুর কন্যা ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় কেন্দ্রীয় ১৪ দলের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানানো হয়।

বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, ১৪ দলের সভায় জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ১৪ দলই যদি থাকে তাহলে তো আমাদের সংসদের ট্রেজারি বেঞ্চে বসার কথা। আর বিরোধী দলে বসতে হলে ১৪ দলে থাকা কেন? আমরা সরকারী না বিরোধী দলে আছি, আমাদের অবস্থান কোথায়- সেটি স্পষ্ট হওয়া দরকার। আমরা যদি ১৪ দলগতভাবে না-ই থাকি, তাহলে আর সরকারী দলের বেঞ্চেই বা বসা কেন?

সাবেক এই তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, যে ২৩ দফার ভিত্তিতে ১৪ দল গঠিত হয়েছিল- তার অনেকগুলো লক্ষ্য অর্জিত হলেও কিছু কাজ এখনও বাকি আছে। এই লক্ষ্য পূরণে আমরা ধারাবাহিকভাবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কাজ করে যাব। দেশে এখনও সাম্প্রদায়িকতা বিরাজমান আছে। স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী, রাজাকার ও তাদের দোসর বিএনপি নির্বাচনে পরাজিত হলেও এখনও চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তাই ১৪ দলের রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা এখনও আছে। এখনও বাংলাদেশ বিপদের মধ্যেই আছে। নতুন প্রেক্ষাপটের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ১৪ দলকে শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে কাজ করতে হবে। আমরা এক সঙ্গে কাজ করব।

সূত্র জানায়, বৈঠকে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি বলেন, দেশে বর্তমানে যে পরিস্থিতি, তাতে মনে হয় আমরা একটি ‘পুলিশি রাষ্ট্র’- এ বসবাস করছি। পুলিশ যা ইচ্ছে তাই করছে। এতে সরকার সম্পর্কেও জনমনে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে।

সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, ১৪ দলে থাকা ছোট বড় সবাইকে মূল্যায়ন করা দরকার। অনেক দল থেকেই এমপি হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন। সর্বশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও কয়েকটি দল থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু অপেক্ষাকৃত ছোট দলগুলো কিছুই পায়নি। এদের মূল্যায়ন হওয়া দরকার।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ১৪ দলের অন্যতম শরিক দল বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নূরুল আম্বিয়ার সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনাও করেন কয়েকজন নেতা। এ বিষয়ে তরিকত ফেডারেশনের সভাপতি নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী এমপি বলেন, ১৪ দলের শরিক হয়েও সম্প্রতি একটি টেলিভিশনের টকশোতে শরীফ নূরুল আম্বিয়া নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে কী-না তা নিয়েও সংশয় জানিয়েছেন তিনি। এতে মানুষের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে এক ধরনের সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর এমন বক্তব্যে সমর্থন জানান ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম এবং জাসদের আরেক অংশের সভাপতি হাসানুল হক ইনু। তারা বলেন, এটা ঠিক নয়। ১৪ দলের মধ্যে থেকে নির্বাচন নিয়ে এমন প্রশ্ন তোলা ঠিক হয়নি। এটা জোটের নীতিরও পরিপন্থী। জোটে থাকতে হলে নীতি মেনেই কথাবার্তা বলতে হবে।

মোহাম্মদ নাসিমের সভাপতিত্বে বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল- বাসদের আহ্বায়ক রেজাউর রশিদ খান, জাতীয় পার্টির (জেপি) এজাজ আহমেদ মুক্তা, কমিউনিস্ট কেন্দ্রের আহ্বায়ক ডাঃ ওয়াজেদুল ইসলাম খান, যুগ্ম আহ্বায়ক ডাঃ অসীত বরণ রায়, গণআজাদী লীগের সভাপতি এস কে সিকদার, গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডাঃ শাহাদৎ হোসেন, বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান প্রমুখ।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.