অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ২৮শে আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৩ই সফর, ১৪৪১ হিজরী

সড়কে মৃত্যুর মিছিল আর কত দীর্ঘ হবে?

Print

দৈনিক চিত্র প্রতিবেদক:
সড়ক-মহাসড়কে যানবাহন দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। এটা যেন সারাদেশের যাত্রী সাধারণের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়কে বের হওয়া মানেই যেন মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া। বাসা থেকে বের হয়ে কেউ যে জীবীত অবস্থায় ফিরতে পারবে, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। ‘দুর্ঘটনায় কারো হাত নেই’ বলে একটা কথা আমাদের দেশে প্রচলিত আছে। তবে এ কথাটি বিশ্বের অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে পুরোপুরি সঠিক নয়। সড়ক অব্যবস্থাপনা, পরিবহন চালকদের অদক্ষতা, বেপরোয়া মনোভাব, ফিটনেসবিহীন যানবাহনকে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য মূলত দায়ী করা হয়। এসব দূর না করে যখন বলা হয়, ‘দুর্ঘটনায় কারো হাত নেই’ তখন তা কোনোভাবেই মানা যায় না। যানবাহন চালায় চালকরা, সেই চালকরা যদি অদক্ষ ও বেপরোয়া হয়, তবে দুর্ঘটনার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার কি কোনো উপায় আছে?

২০১৬ সালে হাইওয়ে পুলিশ মহাসড়কের সবচেয়ে দুর্ঘটনাপ্রবণ ২৯২টি স্পট চিহ্নিত করে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ঝুঁকুপূর্ণ বাঁক, মহাসড়কের সাথে ছোট ছোট সংযোগ সড়ক, বড় বড় গাছ, ট্রাফিক সংকেত ও চিহ্ন না থাকা। এসব ঝুঁকিপূর্ণ স্পট সংস্কারের জন্য ২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবরে রোড ট্রান্সপোর্ট ও হাইওয়ে ডিপার্টমেন্ট মন্ত্রণালয়ে এক হাজার ৩৩ কোটি টাকার বাজেট করে। এ অর্থ সারাদেশের ৬ হাজার কিলোমিটারের মধ্যে যেসব ঝুঁকিপূর্ণ স্পট রয়েছে সেগুলো সংস্কারের জন্য চাওয়া হয়। মন্ত্রণালয় এ অর্থ বরাদ্দ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে সংস্কারের বিষয়টি ঝুলে আছে। এ থেকে বোঝা যায়, মন্ত্রণালয় সড়ক-মহাসড়ক সংস্কারের ক্ষেত্রে চরম শৈথিল্য ও উদাসীনতা দেখাচ্ছে। ফলে দিনের পর দিন দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণ যাচ্ছে, আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করছে। এ অবস্থা আর কতদিন চলবে, তা আমরা জানি না।

খুলনার দৌলতপুরে সরকারি বিএল কলেজের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কিশোর কুমার পাল (৫৫) ট্রাকচাপায় নিহত হয়েছেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে বিএল কলেজের ছাত্ররা বিকেল থেকে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এ সময় কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করে ছাত্ররা। মঙ্গলবার বিকেল ৩টার দিকে খুলনার ফুলতলা উপজেলার দামোদর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যায়ের সামনে যশোর-খুলনা মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত শিক্ষক কিশোর কুমার পাল মহানগরীর ট্যাঙ্ক রোডের বাসিন্দা।

স্থানীয়রা জানান, ট্রাকটি যশোরের দিক থেকে খুলনার দিকে যাচ্ছিল। দামোদর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে থেকে কিশোর কুমার পাল রাস্তা পার হচ্ছিলেন। এ সময় ট্রাকটি তাকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন তিনি।

এ খবর ছড়িয়ে পড়লে বিকেল থেকেই ছাত্ররা কলেজের সামনে জড়ো হতে শুরু করে। এ সময় তারা কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করে। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়।

সরকারি বিএল কলেজের অধ্যক্ষ কে এম আলমগীর হোসেন বলেন, আজকে কিশোর কুমার পাল কলেজে আসেননি। বেশ কয়েক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় তার এক পা ভেঙে যায়। সেই থেকে পায়ে সমস্যা ছিল তার। হাঁটতে কিছুটা জড়তা ছিল। তিনি মানসিকভাবে কিছুটা অসুস্থ ছিলেন। আজ রাস্তার পার হওয়ার সময় ট্রাক চাপায় নিহত হন অধ্যাপক কিশোর কুমার পাল।

এর আগে ১০ ফেব্রুয়ারি রাতে খুলনার রূপসা সেতুর বাইপাস সড়কে ট্রাকচাপায় প্রাইভেটকার আরোহী গোপালগঞ্জের ছাত্রলীগ ও যুবলীগের পাঁচ নেতা নিহত হন।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই উপজেলার নিজামপুর এলাকায় একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা সদ্য দুবাই থেকে দেশে আসা একটি পরিবারের আনন্দ থামিয়ে দিয়েছে। মুহূর্তে আনন্দ রূপ নেয় বিষাদে।
এ দুর্ঘটনায় মাইক্রোবাসে আগুন ধরে দগ্ধ হয়ে নিহত দম্পতির কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার হাসনাবাদ ইউনিয়নের কমলপুর গ্রামের আবদুর রহমান (৬৫) ও তার স্ত্রী কুসুমফুল বেগম (৫৫) এবং মাইক্রোবাসের চালক নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার বাঞ্ছা গ্রামের রুবেল (৩৫) নিহত হন। এ দুর্ঘটনায় মাইক্রোবাস থেকে লাফিয়ে পড়ে আহত হন আরও চারজন। আহতরা হলেন- আবদুর রহমানের ছেলে আবুল কালাম (৩৫), নাতি আবদুল মালেক (১২), মো. রাশেদ (৯) ও স্বজন মো. হাসান (২০)।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আবদুর রহমান ও তার স্ত্রী কুসুমফুল বেগমকে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিহত দম্পতির প্রবাস ফেরত ছেলে আবদুল মমিন।

মঙ্গলবার রাত ৭টার দিকে নিজ বাড়িতে কান্নায় ভেঙে পড়ে আবদুর রহমানের প্রবাস ফেরত ছেলে আবদুল মমিন বলেন, আমি সোমবার দুবাই থেকে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর হয়ে দেশে আসি। এরপর এক আত্মীয়ের বাসায় রাতযাপন করি। চট্টগ্রাম থেকে আমাকে বাড়ি আনার জন্য বাবা আবদুর রহমান, মা কুসুমফুল বেগম, আমার ভাইয়ের ছেলে মালেকসহ ছয়জন একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যায়।

পথিমধ্যে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার নিজামপুর এলাকায় যাওয়ার পর তাদের মাইক্রোবাসে আগুন ধরে দগ্ধ হয়ে আমার বাবা-মা ও মাইক্রোবাসের চালক নিহত হন। খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থলে ছুটে আসি।

আবদুল মমিন বলেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার জন্যই আমার বাবা-মাকে প্রাণ হারাতে হয়েছে। বেঁচে থেকে আমিও মৃত, আল্লাহ আমাকেও নিয়ে যাক। এমন জানলে বিদেশ থেকে দেশে আসতাম না।

এদিকে, নিহত দম্পতির মরদেহ কমলপুর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছার পর শত শত মানুষ ওই বাড়িতে ভিড় জমান। পরিবারের লোকজন ও স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। এ ঘটনায় কমলপুর গ্রামে শোকাবহ পরিবেশ বিরাজ করছে।

পোস্তগোলা ব্রিজে বাস-সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত তিন:
রাজধানীর শ্যামপুর থানাধীন পোস্তগোলা ব্রিজের ওপরে ছালছাবিল পরিবহনের বাসের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- সৈয়দ আহমেদ (৩০), বাচ্চু মিয়া (৬০), বাচ্চু মিয়ার ছেলে জুবায়েত (২৬)। শ্যামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ছালছাবিল পরিবহনের বাস ও সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা অটোরিকশার যাত্রী।

তিনি জানান, বাচ্চু মিয়া কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়া এলাকায় বসবাস করতেন। জুবায়েত কেরানীগঞ্জ ইকুরিয়া কসাইয়ের দোকানে কাজ করত। বাবা বাচ্চু মিয়া ইকুরিয়া থেকে জুবায়েতকে নিয়ে পোস্তগোলা যাচ্ছিল ডাক্তার দেখানোর জন্য। পোস্তগোলা ব্রিজে যাবার পর দুর্ঘটনার শিকার হয় তাদের বাহন সিএনজিটি। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তাদের।

সৈয়দ আহমেদের বাড়ি দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জের কদমতলী মা প্লাজা এলাকায়। তার বড় ভাই খাজা মোহাম্মদ জানান, সৈয়দ আহমেদ যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন মেশিনের ব্যবসা করত। সিএনজিতে তারা শেয়ারে ভাড়ায় যাচ্ছিল। তিনজনের মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় খিলগাঁও কমিউনিটি সেন্টারের সামনে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় আবদুল রাজ্জাক (৬০) নামে এক বৃদ্ধা নিহত হন।
সড়ক দুর্ঘটনা এখন সবচেয়ে বড় দুর্ভাবনা’:

সড়ক দুর্ঘটনা এখন সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্ভাবনা বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। মঙ্গলবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের উন্নয়নসহ সমসাময়িক বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কাদের বলেন, ‘আমি নিজেই বলেছি সড়কে শৃঙ্খলা আসেনি। অবকাঠামোগত প্রকল্পে যত অগ্রগতি সেই তুলনায় সড়ক ও পরিবহনে শৃঙ্খলাটা আসেনি, যার জন্য দুর্ঘটনা বা যানজট রয়েছে।‘

‘সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সভা শিগগিরই ডাকা হবে। নতুন করে কমিটি সাজাবো। নতুনভাবে প্রোগ্রাম নেয়ার চিন্তাভাবনা করছি। নিরাপত্তা কাউন্সিলের সভায় কমিটি করে দেব। তাদের কাছ থেকে অল্প দিনের ব্যবধানে প্রতিবেদন চাইব, পরবর্তীতে যদি টাস্কফোর্স করতে হয় তাও করব’ বলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, ‘এটার (সড়ক দুর্ঘটনা) লাগাম টেনে ধরতে হবে, রাশ টেনে ধরতে হবে। জাতীয় স্বার্থে এবং জাতির দুর্ভাবনা অবসানের স্বার্থে। কারণ সড়ক দুর্ঘটনা এখন আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্ভাবনা, এটা অস্বীকার করে লাভ নেই।’ সড়ক দুর্ঘটনা কি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়- এ বিষয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এখনও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, যেটা সম্ভব সেটা আমি কেন করব না। যেটা সম্ভব সেটা কেন করা যাবে না? করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘বড় গাড়ির সঙ্গে সিএনজি বা ইজিবাইকের যদি সংঘাত হয় আর ইজি বাইকে যদি ১০ জন থাকে, তবে ১০ জনই মারা যায়। বড় বড় গাড়িতে সংঘাত হলে আহত হয়, এ রকম নিহত হয় না। ছোট ছোট যান নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের প্রথম দায়িত্ব।’

ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘অনেকে ইজিবাইক, নসিমন করিমনের সঙ্গে জড়িত, এখানে রাজনৈতিক বিষয়ও আছে। কিন্তু মানুষের জীবনটা আগে বাঁচাতে হবে।’




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.