অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ১১ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৮ই সফর, ১৪৪৩ হিজরী

উড়োজাহাজ বিপর্যয়ে কমছে যাত্রী

Print

বিশেষ প্রতিনিধি : উড়োজাহাজ বিপর্যয়ে যাত্রীদের মধ্যে ভিতি দেখা দিয়েছে। ফলে যাত্রী সংখ্যাও কমে গেছে। ফ্লাইট পরিচালনার জন্য লাইসেন্স পাওয়া এবং রুট পরিচালনার অনুমোদন পাওয়া একটি জটিল প্রক্রিয়া। নানা পরীক্ষা আর বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন পাওয়ার পরই উড়োজাহাজ আকাশে ওড়ার অনুমতি পায়। তারপরও যান্ত্রিক ত্রæটির কারণে দুর্ঘটনা থেমে নেই। নেপালে ইউএস বাংলার উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার রেশ না কাটতেই যান্ত্রিক ত্রæটির কারণে সৈয়দপুরের উদ্দেশে উড্ডয়নের পরপরই বিমানের উড়োজাহাজ জরুরি অবতরণ করতে হয়।

গতকাল মালয়েশিয়ার উদ্দেশে উড্ডয়নের ১৫ মিনিটের মধ্যে জরুরি অবতরণ করতে হয়েছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজকে। এছাড়া গত তিন মাসে ৩টি উড়োজাহাজ যান্ত্রিক ত্রæটির কবলে পড়ে।

বাংলাদেশে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পর বেসরকারি খাতে যাত্রী পরিবহণসেবা চালু হয় ১৯৯৬ সালে। এরপর একে একে ১২টি বেসরকারি কোম্পানি এই খাতে এলেও লোকসানে পড়ে ৯টি প্রতিষ্ঠানই গুটিয়ে নেয় তাদের ব্যবসা। নানা প্রচেষ্টার পর এখনো বিমান পরিচালনার ব্যবসা খুব একটা লাভজনক খাত হিসেবে গড়ে ওঠেনি বাংলাদেশে। এমন অবস্থায় নেপালের এই দুর্ঘটনায় বিমান পরিবহন খাতে ক্ষতিকর প্রবণতা দেখা দিয়েছে।

পরিস্থিতি বিষয়ে বাংলাদেশ বিমানের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এমএ মোমেন বলেন, নেপালের দুর্ঘটনা বাংলাদেশের এভিয়েশনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা। এর কোনো না কোনো প্রভাব তো পড়বেই। তবে এখানে বিমান পরিবহণ ব্যবসায় যাত্রীর সংখ্যা ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি। এবং ট্যুরিস্টের চেয়ে কাজের প্রয়োজনে বিমান ভ্রমণ বেশি হয়। তাই এ দেশে এর ইম্প্যাক্ট খুব বেশি হওয়ার কথা না। এটা বেশিদিন থাকবে না। তাই এয়ারলাইন্সগুলো যাত্রীদের আস্থা কত দ্রæত ফেরাতে পারছে তার ওপরই নির্ভর করছে অনেক কিছু। তবে যাত্রীদের মধ্যে অবশ্যই একটা ভীতি কাজ করছে।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, ফ্লাইট পরিচালনার জন্য লাইসেন্স পাওয়া একটি জটিল প্রক্রিয়া। আভ্যন্তরীণ রুটে কিছুটা সহজে পাওয়া গেলেও আন্তর্জাতিক রুটে এটি ভীষণ কষ্টকর। কারণ এর সঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সিভিল এভিয়েশন, বিদেশি দূতাবাস, সংশ্লিষ্ট দেশের সিভিল এভিয়েশন জড়িত। এসব জায়গায় চিঠি চালাচালির মাধ্যমে কাজটি সম্পন্ন করতে হয়। এয়ারলাইন্সগুলোকে নিজ নিজ দেশের সিভিল এভিয়েশনে আবেদন জমা দিতে হয়। এরপর অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এক্ষেত্রে সিভিল এভিয়েশনই মুখ্য ভ‚মিকায় থাকে।

জানা যায়, একটি বেসরকারি এয়ারলাইন্স যখন বাংলাদেশে ব্যবসা করতে যায় তখন সিভিল এভিয়েশন থেকে এয়ার অপারেটিং সার্টিফিকেট নিতে হয়। এরপর তারা যে উড়োজাহাজটি নিয়ে আসবে সেটির কাগজপত্র জমা দিতে হয়। সিভিল এভিয়েশন এরপর সংশ্লিষ্ট এয়ারক্র্যাফটটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য ইন্সপেকশন টিম পাঠায়। উড়োজাহাজটি আনা যাবে কিনা তা তাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়। রুট পারমিটের বিষয়েও সিভিল এভিয়েশন দায়িত্ব পালন করে।

এতো পথ-ঘাট পাড়ি দেওয়ার পরও উড়োজাহাজের সমস্যা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। তবে এতো ঘনঘন সমস্যা হওয়াটা ব্যবসায়ের জন্য সুখকর নয় বলেই তাদের অভিমত।

এ বিষয়ে বেসরকারি রিজেন্ট এয়াওয়েজের সিইও লে. জে. (অব.) এমএফ আকবর জানান, যাত্রীদের মানসিক উদ্বেগ বা আতঙ্ক কাটাতে আমাদের নিরাপত্তা পদক্ষেপগুলো তাদের জানানো হচ্ছে। একইসঙ্গে বিমানের ফিটনেস, পাইলট ও কেবিন ক্রুদের প্রশিক্ষণসহ আনুষঙ্গিক সকল বিষয় রিফ্রেশ করা হচ্ছে।

নেপালে ইউএস বাংলার উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত এবং পর পর দুটি উড়োজাহাজের উড্ডয়নের অল্প সময়ের মধ্যে যান্ত্রিক ত্রæটির কারণে জরুরি অবতরণ করায় যাত্রীদের মধ্যে যে ভীতি তৈরি হয়েছে তার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন রুটে যাত্রী হারাচ্ছে বাংলাদেশের বিমান পরিবহন সংস্থাগুলো। বিশেষত, নেপালগামী ফ্লাইটে এর বড় প্রভাব দেখা যাচ্ছে বলে জানাচ্ছে কোনো কোনো পরিবহণ সংস্থা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। যাত্রী এবং এয়ারক্রাফট সংকটে প্রতিষ্ঠানটির নেপালগামী সব ফ্লাইট বন্ধ করা হয়েছে অনির্দিষ্টকালের জন্য। এছাড়া অন্য রুটেও ঘটছে টিকেট বাতিলের ঘটনা। তবে এই প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের বিমান পরিবহণ খাতে খুব একটা ক্ষতির কারণ হবে বলে মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বিমানের মুখপাত্র শাকিল মেরাজ জানান, নেপালগামী ফ্লাইটে যাত্রী হারাচ্ছে বাংলাদেশ বিমান। তবে কাঠমান্ডু সেক্টরে আমাদের ওপর প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে যারা ছুটি কিংবা অবসর কাটাতে নেপালে যান এ ধরনের কিছু গ্রæপ বুকিং বাতিল হয়েছে। দুর্ঘটনার পর নেপালে যাত্রীর সংখ্যা কমে গেছে। তবে নেপাল বাদে বিমানের অন্য রুটের ফ্লাইটগুলোতে যাত্রী সংখ্যায় তেমন হেরফের নেই বলে জানান তিনি।

বেসরকারি বিমান পরিবহণ সংস্থা নভো এয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুল ইসলাম জানান, নেপাল ঘটনার পর তাদের পরিবহণেও এর কিছুটা প্রভাব পড়েছে। তবে সেটা খুব বেশি ক্ষতির কারণ হবে না বলে তিনি জানান।

গতকালও ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে উড্ডয়নের ১৫ মিনিটের মধ্যে আবারও ঢাকায় জরুরি অবতরণ করতে হয়েছে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজকে। ইউএস বাংলার জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তবে বিমানে কোনো যান্ত্রিক ত্রæটি ছিল না বলে দাবি তার। তার দাবিÑ উড়োজাহটি উড্ডয়নের ১৫ মিনিট পর মনিটরে একটি সতকর্তামূলক ‘সাইন’ দেখতে পান পাইলট। কিছুক্ষণ পর সেটি আবার চলে যায়।

বোয়িং ৭৩৭-৮০০ মডেলের বিএস-৩১৫ উড়োজাহাজটি গতকাল সকাল ৮টা ৫০ মিনিটের দিকে ১৬৪ জন যাত্রী নিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে উড্ডয়ন করে। এর ১৫ মিনিট পরই শাহজালালে ফিরে আসে উড়োজাহাজটি। পরে বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে আবার মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করে বিমানটি।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

%d bloggers like this: