অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২রা জিলক্বদ, ১৪৪২ হিজরী

এক কিংবদন্তির গল্প

Print

অনলাইন ডেস্ক: ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শুরুটা ‘মুখ ও মুখোশ’ দিয়ে। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর থেকে ঢাকাই চলচ্চিত্র নির্মাণে এগিয়ে অাসেন তত্কালীন চলচ্চিত্র প্রেমী বাঙালি মুসলমানরা। যদিও খুব ধীরে ধীরে এগুচ্ছিল চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়া। হিন্দি ও উর্দু ছবির সঙ্গে এই কাঁচা নির্মাণের চলচ্চিত্রগুলো টেক্কা দিয়ে পারছিল না। তবে এই অবস্থা বেশিদিন থাকেনি। বাংলার যাত্রাপালার গল্প ‘রূপবান’কে সেলুলয়েডে বন্দি করার পর থেকে হলমুখী হতে থাকে দর্শক। এর কিছুদিন পরেই রূপালি পর্দায় হাজির হন এক নায়ক।তিনি আব্দুর রাজ্জাক। মহিলা দর্শক আর টিনএজ সমাজে এই হ্যান্ডসাম নায়কের কদর বেড়ে যাওয়ায় পরিচালকরা তাঁকে নিয়েই প্রেমের ছবি নির্মাণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। যদিও ১৯৭৩ সালে জহিরুল হক পরিচালিত ‘রংবাজ’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে প্রথম অ্যাকশন নায়ক হিসেবেও পর্দায় পদার্পন করেন তিনি।
ষাটের দশকের শেষে এসে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রধানতম নায়কের তকমা অর্জন করেন তিনি। যে গৌরব তিনি ধরে রাখেন সত্তর ও আশির দশক পর্যন্ত। পরবর্তীতে তিনি নায়করাজ উপাধিতে ভূষিত হন। পাঁচ শতাধিক ছবিতে অভিনয় করা নায়করাজকে ছাড়িয়ে যেতে পারেননি আর কোন অভিনেতা।
রাজ্জাকের জন্ম ভারতের কলকাতার টালিগঞ্জের নাকতলায়। ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি তিনি জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতাতেই তিনি বেড়ে ওঠেন। কলকাতার খানপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় স্বরসতী পূজা চলাকালীন সময়ে মঞ্চ নাটকে অভিনয়ের জন্য তার গেম টিচার রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁকে বেছে নেন নায়ক অর্থাত্ কেন্দ্রীয় চরিত্রে। এভাবেই অভিনয়ে সম্পৃক্ত হন নায়করাজ। স্কুলে পড়ার সময় ‘বিদ্রোহ’ নাটকে আর কলেজ জীবনে মাত্র ২২ বছর বয়সে ‘রতন লাল বাঙালি’ নামক চলচ্চিত্রে প্রথম অভিনয় করেছিলেন তিনি।
দেশ-বিভাগের শিকার হয়ে রাজ্জাককে পাড়ি জমাতে হয় বাংলাদেশে।১৯৬৪ সালে স্ত্রী মেহেরুন নেসা লক্ষ্মী ও সন্তান বাপ্পারাজকে সঙ্গে নিয়ে এদেশে নিবাস গড়েন।এই ফাঁকে বলে রাখি তিনি তিন সন্তানের জনক। দুই ছেলে বাপ্পারাজ ও সম্রাট এবং মেয়ে ময়নাকে নিয়েই তাঁর সংসার। দুই ছেলে’র পাশাপাশি মেয়ে ময়নাও শিশুশিল্পী হিনেবে অভিনয় করেছেন।
ঢাকায় আসার পর অবর্ণনীয় কষ্ট আর সংগ্রাম মুখর জীবন যাপন করেন নায়করাজ। প্রথমে ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করা শুরু করেন। পূর্ব পাকিস্তান টেলিভিশনে (বর্তমান বাংলাদেশ টেলিভিশন) ‘ঘরোয়া’ নামের একটি ধারাবাহিক নাটকের মাধ্যমে এই দেশের শোবিজ অঙ্গনে প্রথম পা রাখেন তিনি।কিন্তু এই মাধ্যমে স্থায়ী হননি তিনি। কারণ চিন্তাজুড়ে ছিল চলচ্চিত্র। তবে মজার ব্যাপার যে, চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে সফল হলেও এই নায়ক কিন্তু চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেছিলেন সহাকরি পরিচালক হিসেবে। মুখ ও মুখোশ খ্যাত পরিচালক আব্দুল জব্বার খানের সঙ্গে কাজ করতেন তিনি। কিন্তু অভিনয়ের অদম্য নেশা যার মনে তাঁকে রুখে কে। ঠিকই সুযোগ পেয়ে যান চলচ্চিত্রে অভিনয়ের। সালাউদ্দিন প্রোডাকশন্সের ‘তেরো নাম্বার ফেকু অস্তাগড় লেন’ চলচ্চিত্রে ছোট্ট একটি চরিত্রে অভিনয় করার মধ্য দিয়ে রূপালি পর্দায় প্রথম অভিষেক ঘটে তাঁর। ছোট্ট ঐ একটি দৃশ্যেই রাজ্জাক বোঝাতে পেরেছিলেন তাঁর মেধার দৌড় কতটুকু। পরিচালকরা তাঁকে ছবিতে নিতে থাকেন। চরিত্রাভিনেতা হিসেবে তিনি ‘কার বউ’, ‘ডাক বাবু’, ‘আখেরী স্টেশন’সহ বেশ কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন।
নায়করাজের অভিনয় দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে জহির রায়হান তাঁর ছবির নায়ক হিসেবে মনোনীত করেন রাজ্জাককে। ১৯৬৬ সালে জহির রায়হান নির্মিত লোকগল্পের ছবি ‘বেহুলা’তে অভিনয় করার মাধ্যমে তিনি একক নায়ক হিসেবে যাত্রা শুরু করেন।এরপর আর থেমে থাকতে হয়নি নায়করাজকে। সেসময়ে প্রায় ৩০০টি বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি।
প্রযোজক পরিচালক হিসেবেও তিনি সুনাম অর্জন করেছেন। ১৯৭৭ সালে রাজ্জাক ‘অনন্ত প্রেম’ ছবি নির্মাণের মধ্য দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এ যাবৎ প্রায় ১৬টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন তিনি। প্রযোজক হিসেবে গড়ে তোলেন ‘রাজলক্ষী প্রোডাকশন’। এ সংস্থার উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হচ্ছে, ‘অনন্ত প্রেম’, ‘বেঈমান’ ‘বদনাম’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’, ‘প্রেমশক্তি’, ‘ঢাকা ৮৬’, ‘জিনের বাদশা’, ‘চাপাডাঙ্গার বউ’, ‘বাবা কেন চাকর’, ‘সৎ ভাই’, ‘সন্তান যখন শত্রু’, ‘প্রেমের নাম বেদনা’, ‘আমি বাঁচতে চাই’, ‘কোটি টাকার ফকির’সহ অসংখ্য ছবি। এর ভেতর ‘চাপা ডাঙার বউ’ ছবির মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রে আনেন বড়ছেলে বাপ্পারাজকে আর ‘আমি বাঁচতে চাই’ ছবি দিয়ে চলচ্চিত্রে আনেন ছোটছেলে সম্রাটকে।
শূন্য দশকে এসে অশ্লিলতার কারণে নায়করাজ চলচ্চিত্র থেকে বেশ দূরে ছিলেন। রুচিসম্মত কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করলেও ব্যাপকহারে এ সময়ে তাঁকে দেখা যায়নি। চলচ্চিত্রের অবস্থা আবার ভাল হওয়ায় তিনি আবারও অভিনয় করছেন। সর্বশেষ তিনি ‘পূর্ণদৈর্ঘ প্রেম কাহিনী’ ছবিতে অভিনয় করেন। এ ছাড়া আরও বেশ কিছু ছবি মুক্তির অপেক্ষায় আছে। মাঝে অসুস্থতাজনিত কারণে অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছাও ব্যক্ত করেন তিনি।
রাজ্জাক অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র:
সুরুর বারা বাঙ্কভি পরিচালিত ‘আখেরি স্টেশন’ বশীর হোসেন-এর ‘১৩ নং ফেকু ওস্তাগার লেন’ সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘কাগজের নৌকা’(১৯৬৬) জহির রায়হান-এর ‘বেহুলা (১৯৬৬) আমজাদ হোসেন ও নূরুল হক পরিচালিত আগুন নিয়ে খেলা(১৯৬৭) জাহির রায়হান এর আনোয়ারা (১৯৬৭), সুভাষদত্ত পরিচালিত আবির্ভাব (১৯৬৮) নারায়ণ ঘোষ মিতা এতটুকু আশা ১৯৬৮ কাজী জহির পরিচালিত ‘ময়নামতি’ (১৯৬৯)নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত নীল আকাশের নীচে (১৯৬৯)। কামাল আহমেদ পরিচালিত ‘অশ্রু দিয়ে লেখা (১৯৭২) চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘ওরা ১১জন’ (১৯৭২)।
চলচ্চিত্রে অবদান রাখার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার আজীবন সম্মাননা-২০১৩ তে ভূষিত হন তিনি। এ ছাড়া অসংখ্য পুরস্কার পান নায়করাজ।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

%d bloggers like this: