অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১২ই সফর, ১৪৪৩ হিজরী

কান্না ভেজা চোখে শেষ বিদায়

Print

নিজস্ব প্রতিবেদক : নেপালে ইউএস-বাংলার মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুর এক সপ্তাহ পরে দেশের মাটিতে নিহতদের মরদেহ পৌঁছালো। সারিবদ্ধ কফিনে ২৩ জনের মরদেহ রাখা হয়। কান্না ভেজা চোখে প্রিয়জনদের শেষ বিদায় জানান স্বজনরা। সোমবার বেলা ৪টার দিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ১ নম্বর ভিভিআইপি টার্মিনালে মরদেহগুলো নিয়ে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ বিমান অবতরণ করে।
মরদেহগুলো গ্রহণ করেন সড়ক ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও বিমানমন্ত্রী একেএম শাহজাহান কামাল। বিকাল পাঁচটার দিকে জানাজা ও আনুষ্ঠানিকতার জন্য মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সগুলো বিমানবন্দর থেকে আর্মি স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয়। আর্মি স্টেডিয়ামে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের পক্ষ থেকে নিহতদের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান সামরিক সচিব এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানান সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
৫টা ২০ মিনিটে আর্মি স্টেডিয়ামে ওই ২৩ জনের জানাজা সম্পন্ন হয়। জানাজা পড়ান সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমাম মাওলানা মো. মাহমুদুল হক। সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান, সরকারি কর্মকর্তা, সেনাকর্মকর্তা, নিহতদের স্বজন-সহকর্মী ও বিভিন্ন স্তরের মানুষ জানাজায় অংশ নেন। জানাজা শেষে নিহত ২৩ বাংলাদেশির মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সন্ধ্যা পৌনে ছয়টায় শুরু হয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে চলে এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া। আগে থেকেই স্বজনদের আহাজারিতে স্টেডিয়ামের পরিবেশ ভারী হয়ে ছিল। মরদেহ হস্তান্তরের সময় রোল ওঠে কান্নার। একেকজনের নাম ঘোষণা হয় আর কান্নার রোল আরও উচ্চকিত হয়। হৃদয়বিদারক এই পরিবেশ চোখে জল আনে উপস্থিত সবার। মরদেহ হস্তান্তরের সময় সহযোগিতা করেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। তারা মরদেহগুলো একে একে বয়ে এনে স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দিয়ে গাড়িতে তুলে দেন।
নিহতদের নাম লেখা কফিনের পাশে স্বজনরা কিছুক্ষণ থাকার সুযোগ পান। সেখানে আপনজনের নাম লেখা কফিন দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। এরপর সোয়া ৯টার দিকে বিমানবন্দরে নেওয়ার জন্য গাড়িতে তোলা হয় কফিনগুলো। নেপালে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স সূত্রে জানা যায়, নিহত ২৬ বাংলাদেশির মধ্যে ২৩ জনের লাশ শনাক্ত করা হয়। তারা হলেন-বেগম হুরুন নাহার বিলকিস বানু, এস এম মাহমুদুর রহমান, ফয়সাল আহমেদ, বিলকিস আরা মিতু, নাজিয়া আফরিন চৌধুরী, আখতারা বেগম, মো. রকিবুল হাসান, মো. রফিকুজ্জামান, সানজিদা হক, অনিরুদ্ধ জামান, মো. হাসান ইমাম, তামারা প্রিয়ন্ময়ী, তাহারা তানভীন শশী রেজা, ফ্লাইটের পাইলট আবিদ সুলতান, কো-পাইলট পৃথুলা রশীদ ও মিনহাজ বিন নাসির, আঁখি মনি, এফ এইচ প্রিয়ক, শারমীন আক্তার নাবিলা, উম্মে সালমা, মো. মতিউর রহমান, খাজা হুসাইন ও মো. নুরুজ্জামান। নিহত ২৬ বাংলাদেশির মধ্যে ৩ জনের মরদেহ শনাক্ত করা যায়নি। তারা হলেন- আলিফউজ্জামান, পিয়াস রায় ও মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। তাদের মরদেহ ডিএনএ পরীক্ষার পর দেশে আনা হবে।
উল্লেখ্য, ১২ মার্চ ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি বিমান কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের সময় বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় ৪৯ আরোহীর মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে চার পাইলট-ক্রুসহ ২৬ জন বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে ২৩ জনকে শনাক্ত করে গতকাল দেশে নিয়ে আসা হয়।
এদিকে সোমবার পর্যন্ত এ ঘটনায় আহত ১০ বাংলাদেশির মধ্যে সাত জনকে দেশে ফেরত আনা হয়। সর্বশেষ গতকাল আহত কবীর হোসেনকে দেশে আনা হয়। রোববার দেশে ফিরেয়ে আনা হয় আহত শাহিন বেপারীকে। এর আগে শাহরিন আহমেদ, কামরুন্নাহার স্বর্ণা, মেহেদী হাসান, আলমুন্নাহার এ্যানি ও রাশেদ রুবায়েত দেশে ফেরেন। তারা সবাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। বাকি তিন জন সিঙ্গাপুর ও ভারতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আর্মি স্টেডিয়ামে স্বজনদের কান্নার রোলঃ কেউ বসে বসে কাঁদছেন। কেউ আবার কাউকে স্বান্তনা দেয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কোনো স্বান্তনাই যেন কাজে আসছে না। কারণ এক সপ্তাহ আগে যে স্বজনরা সুস্থভাবে নেপালের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন তারা দেশে ফিরেছেন কফিনে মোড়ানো অবস্থায়! বিকালে রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত ২৩ বাংলাদেশির মরদেহ আনার পর তাদের স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। স্বজনদের আহাজারিতে আর্মি স্টেডিয়ামের আকাশ যেন ভারী হয়ে ওঠে। এক সপ্তাহ আগে স্বজনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নেপালের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন অনিরুদ্ধ জামানসহ ২৬জন বাংলাদেশি নাগরিক। কিন্তু কাঠমন্ডুতে বিমান দুর্ঘটনায় তারা নিহত হন।
এরপর স্বজনদের কাছে একে একে মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হয়। যখন মাইকে একেক জনের নাম ঘোষণা করা হয় তখন গোটা স্টেডিয়ামে শোকাবহ পরিবেশ বিরাজ করে। স্বজনদের কান্নায় জানাজায় অংশ নিতে আসা সাধারণ মানুষও চোখে পানি ধরে রাখতে পারেননি। ইউএস-বাংলার কো-পাইলট পৃথুলা রশীদের বাবা কাজল, মা মাহফুজা, খালা ফিরোজা এবং মামা সাইফুর রহমান এসেছিলেন।
পৃথুলার মামা সাইফুর রহমান জানান, তার ভাগ্নির লাশ শ্যামলীতে আশা টাওয়ারে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে বাদ মাগরিব জানাজা শেষে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হবে। নিহত যাত্রী নজরুল ইসলাম এবং আক্তারা বেগমের স্বজনরাও এসেছেন। তারা জানান, আক্তারা বেগমের লাশ এখান থেকেই রাজশাহীতে নিয়ে যাবেন। আর্মি স্টেডিয়ামে এসেছেন নিহত এসএম মাহমুদুর রহমানের স্ত্রী সানজিদা আফরিন এবং তার শাশুড়ি। তারা জানিয়েছেন, মাহমুদুর রহমানের লাশ ফরিদপুর নিয়ে যাওয়া হবে। স্টেডিয়ামে এসেছিলেন ইউএস-বাংলার ২২১ ফ্লাইটের কেবিন ক্রু খাজা হোসেন মোহাম্মদ শাফির তিন খালা শাশুড়ি। স্বজনরা জানান, রাজধানীর বেগমবাজারের পারিবারিক কবরস্থানে শাফির মরদেহ দাফন করা হতে পারে। নিহত যাত্রী মতিউর রহমানের বড় ভাই মোকছুদুর রহমান লাশ নিতে এসেছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি ফেনীতে নিয়ে যাওয়া হবে লাশ। এটুকু বলার পর তিনি আর কোনও কথা বলতে পারছিলেন না। এছাড়াও নেপালে নিহত পরিকল্পনা কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উম্মে সালমা ও নাজিয়া আফরিনের একজন সহকর্মী বলেন, আমরা সহকর্মীর জানাজায় অংশ নেয়ার জন্য এসেছি। তারা দুজন অত্যন্ত মেধাবী কর্মকর্তা ছিলেন। সরকারের উন্নয়ন কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সরকারি কাজেই তারা নেপাল যাচ্ছিলেন। তাদের এভাবে চলে যাওয়ায় দেশের জন্য ক্ষতি হয়ে গেল। আমরা কাজের মধ্য দিয়ে তাদেরকে স্মরণ করবো।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

%d bloggers like this: