অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ৭ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৫ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরী

খোলামেলা পরিবেশ পেয়ে আনন্দে উৎফুল্ল বন্দিরা

Print

দৈনিক চিত্র রিপোর্ট: কেরানীগঞ্জের নতুন ঠিকানায় গিয়ে খুশি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দিরা। শুক্রবার ২২৮ বছরের পুরনো ও ঘিঞ্জি কারাপরিবেশ থেকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার সুপরিসর নতুন কারাগারে স্থানান্তর করায় তাদের এই আনন্দ। গতকাল শনিবার নিয়মিত কারা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শুরু হলেও নতুন ঠিকানায় হাসি-খুশিতেই প্রথম দিনটি কেটেছে ৬ হাজার ৫১১ হাজতি ও কয়েদির। আর দ্বিতীয়দিন পুরান ঢাকার কারাগার থেকে জিনিসপত্রগুলো নতুন কারাগারে নিয়ে বিভিন্ন কক্ষ সাজানোর কাজে ব্যস্ত দিন কাটান কারা কর্মকর্তা ও রক্ষীরা। তবে প্রথম দু’দিনই খাবার ও স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎসহ একাধিক ক্ষেত্রে দুর্ভোগে পড়েন কারারক্ষী, বন্দি ও তাদের স্বজনরা।
কারা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক কর্নেল মো. ইকবাল হোসেন বলেন, বন্দি স্থানান্তরে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সাফল্য এসেছে। তবে টুকিটাকি কিছু অসুবিধা যে ঘটেনি তা নয়। গতকাল শনিবার নতুন কারাগারের প্রথম দিন বন্দি গুণতিসহ কারা আনুষ্ঠানিকতার প্রায় কাজও সম্পাদন করা গেছে। আর নতুন ঠিকানার খোলামেলা পরিবেশে বন্দিরা আনন্দে উৎফুল্ল। যে ক’জন বন্দির সঙ্গে কথা হয়েছে তারা সবাই আনন্দ প্রকাশ করেছে। সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছে। তবে প্রথম দিন সাক্ষাৎপ্রার্থীদের সঙ্গে বন্দিদের দেখা করার সুযোগ দেয়া যায়নি। গত শুক্রবারও তা সম্ভব হয়নি। ওই দিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত নাজিম উদ্দিন রোড থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত স্থানীয় ও পথচারীদের চলাচলেও অসুবিধা হয়েছে। আমাদের আগেই তা ঘোষণা দেয়ার প্রয়োজন ছিল। অনিচ্ছাকৃত এ ভুলের জন্য কারাঅধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দুঃখও প্রকাশ করেন তিনি।
সরজমিনে দেখা যায়, পুরনো কারাগারের মতো নতুন কারাগারেও একই নামের কারাভবনে বন্দিদের ঠাঁই হয়েছে। তবে ওই দিন সহজ সাক্ষাতের আশায় অন্যদিনের চেয়ে বেশি স্বজন আসেন। কিন্তু প্রথম দিকের অগোছালো অবস্থায় সাক্ষাতের ব্যবস্থা করতে পারেনি কারা কর্তৃপক্ষ। এতে মনক্ষুণœ হয়েছেন বন্দি ও স্বজনরা। গ্যাসের চুলা না থাকায় লাকড়ির চুলায় রান্নায়ও অসুবিধা এবং দেরি হয়েছে। গতকাল পুরোদমে পুরাতন কারাগার থেকে জিনিসপত্র নতুন কারাগারে নেয়ার কাজ চলে। নতুন কারাগারে পৌঁছার পর সাজানো হচ্ছিল বিভিন্ন কারাকক্ষ। অবশ্য বন্দিরা সঙ্গে থাকা পোশাকসহ টুকিটাকি জিনিসপত্র প্রিজনভ্যানে নিজেদের সঙ্গেই বহন করেন। বন্দি স্থানান্তরের কাজটি যথাযথভাবে শেষ হওয়ায় বাকি কাজগুলোও সহজে শেষ হবে বলে মনে করছেন কারা কর্মকর্তারা।
একাধিক কারাকর্মকর্তা জানান, ১৭৮৮ সালে স্থাপিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দিদের সাড়ে ৬ হাজার বন্দিকে গত শুক্র ও শনিবার দিনের আলোয় কেরানীগঞ্জের নতুন কারাগারে স্থানান্তরের পরিকল্পনা ছিল। প্রথমদিন শেষ রাত থেকে দু’কারাগারের মাঝখানে ১২ কিলোমিটার দূরত্বে ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ভোর ৬টায় কারারক্ষী, পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব, ফায়ার সার্ভিস ও দমকল বাহিনী, চিকিৎসকের সমন্বয়ে প্রথম কনভয় ৮টি প্রিজনভ্যানসহ ১৫টি গাড়ি নিয়ে কেরানীগঞ্জের উদ্দেশ্যে প্রথম যাত্রা করে। নিরাপত্তাসহ পারিপার্শ্বিক সব পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় শুক্রবার রাতে প্রায় সাড়ে ১০টা পর্যন্ত বন্দি পরিবহন করা হয়। রাত সাড়ে ৯টায় সর্বশেষ ১৯তম কনভয় পুরান ঢাকা থেকে রওয়ানা দিয়ে রাত ১০টার দিকে কেরানীগঞ্জে পৌঁছে। বন্দি নামিয়ে প্রিজনভ্যানগুলো বের হওয়ার পর রাত সাড়ে ১০টায় কেরানীগঞ্জের কারাফটক বন্ধ করা হয়। দুরূহ কাজটি একদিনেই শেষ হওয়ায় সন্তুষ্ট কারাকর্তৃপক্ষও। যেসব বন্দিরা ঢাকায় সুরমা, যমুনা বা যে যে ভবন বা ওয়ার্ডে ছিলেন, নতুন কারাগারে তাদের একই নামের নতুন ভবনে তোলা হয়। তবে নতুন কারাগারের কক্ষগুলো যেমন প্রশস্ত, তেমনি ভবনের করিডোর, বারান্দা, সিঁড়ি, বাথরুম ইত্যাদিও প্রশস্ত। আনন্দে জানালা দিয়ে এক কক্ষ থেকে জোর গলায় অন্য কক্ষের বন্দিদের সঙ্গে কথাও বলে বন্দিরা। কেরানীগঞ্জের খোলামেলা পরিবেশে ভবনের মধ্যেও গায়ে লাগে শীতল হাওয়া। নিজেদের কক্ষ থেকে বন্দিরা দেখছে দূরের দৃশ্য। গতকাল শনিবার সকালে কারা ওয়ার্ড বা কক্ষ থেকে বন্দিদের কক্ষের বাইরে খোলা পরিবেশে ছেড়েও দেয়া হয়। তারা বাইরে বের হয়ে ঘুরাফেরা করেন। হাসি-উল্লাসে মেতে উঠেন।
এদিকে নতুন কারাগারে কারারক্ষীদের থাকার জন্য যথেষ্ট ব্যারাকও স্থাপিত হয়নি। ফলে এরই মধ্যে আবাসন সংকটে পড়েছেন কারারক্ষীরা। এলাকায় ভালো স্কুল-কলেজ না থাকায় সন্তানদের পড়াশুনা নিয়েও চিন্তিত অনেকে। সাক্ষাৎপ্রার্থী মো. আজাদ হোসেন বলেন, ছেলে রফিকুল ইসলামকে দেখার জন্য এসেছিলাম। দেখা করতে পারিনি। আগামীকাল থেকে দেখা করা যাবে বলে জানানো হয়েছে। অপর সাক্ষাৎপ্রার্থী লায়লা বেগম বলেন, এত কষ্ট করে ভাই দেলোয়ার হোসেনকে দেখতে এসেছিলাম। এখন ফিরে যেতে হচ্ছে।
তবে কারাকর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আজ রোববার থেকে সাক্ষাৎপ্রার্থীদের সঙ্গে বন্দিদের সাক্ষাৎ করার যাবে। তবে সাক্ষাৎকক্ষটি প্রয়োজনের তুলনায় ছোট। এক সঙ্গে সর্বোচ্চ ৪০ জন বন্দি স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পাবে। এজন্য ৮০ জনের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন আরো একটি সাক্ষাৎকক্ষ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তা নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত সাক্ষাতের ভোগান্তি কাটছে না। এছাড়া বন্দি স্থানান্তর সংক্রান্ত জটিলতায় গত দু’দিন জামিন পাওয়া আসামিদের মুক্তি দেয়া হয়নি। রোববার থেকে জামিন পাওয়া আসামিদের মুক্তি দেয়া হবে। হাজতি ও কয়েদিদের নিয়মিতভাবে আদালতে পাঠানো শুরু করা যাবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
জেলার নেছার আলম বলেন, আগের তুলনায় কেরানীগঞ্জ কারাগার পরিবেশ অত্যাধুনিক। কারাগারটি খোলামেলা হওয়াতে বন্দিরা অনেক আনন্দিত। নিয়মানুযায়ী বন্দিদের খাবার দেয়া হচ্ছে। গ্যাসের পরিবর্তে লাকড়ি দিয়ে খাবার রান্না করতে হচ্ছে।
এদিকে রাজধানীর নাজিম উদ্দিন রোডের সোয়া দুই শতাব্দীর ব্যস্ততার চিত্র পাল্টে গেছে। সড়কে নেই যানজট। কারাফটক ঘিরে নেই নিত্য দিনের ভিড়। নেই সশস্ত্র কারারক্ষীর পাহারা। বন্দির স্বজনদের দৌড়-ঝাঁপ। কিংবা প্রিজনভ্যানের হুইসেল।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

%d bloggers like this: