অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ১৩ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২০শে সফর, ১৪৪৩ হিজরী

তুমব্রু সীমান্ত থমথমে : উত্তেজনার মধ্যে দুদেশের পতাকা বৈঠক

Print

কক্সবাজার প্রতিনিধি : বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু সীমান্তে কোনাপাড়ার নো-ম্যান্স ল্যান্ডে হঠাৎ করে অতিরিক্ত সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়েছে মিয়ানমার। সেই সাথে ফাকা গুলিবর্ষণ ও মই দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা চালায় মিয়ানমার সেনারা। এরই প্রেক্ষিতে শুক্রবার ঘুমধুম নো-ম্যান্স ল্যান্ডে বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিজিবি ও মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ বিজিপির মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৈঠকে ততুমব্রু সীমান্তে নিজেদের অংশে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বাড়তি সেনা মোতায়েন করেছিল বলে জানিয়েছে মিয়ানমার। একই কারণে তারা সীমান্ত এলাকায় ফাঁকা গুলি ছুড়েছিল বলেও দাবি করেছে। শুক্রবার বিকাল ৩টার দিকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ক্যাম্পে পতাকা বৈঠকে বসে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী। বিকাল ৪টা ৪০ মিনিটের দিকে বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান নাইক্ষ্যংছড়িস্থ ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মঞ্জুরুল হাসান খান।
মঞ্জুরুল হাসান খান বলেন, মিয়ানমার সীমান্ত পুলিশ আরো জানিয়েছে, ভবিষ্যতে সীমান্ত এলাকায় ফাঁকা গুলির আগে বাংলাদেশকে অবহিত করবে। তিনি আরো বলেন, মিয়ানমার সীমান্ত পুলিশ বিজিবির কাছে প্রশ্ন করে, সীমান্তে বাংলাদেশ কেন সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছে। জবাবে আমরা জানাই, এটা মিয়ানমারকে টার্গেট করে করা হয়নি, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যই আমরা এটা করেছি। মঞ্জুরুল হাসান খান বলেন, তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের যেকোনো সময় নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানিয়েছে মিয়ানমার সীমান্ত পুলিশ। তিনি জানান, সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক আছে। শূন্যরেখায় থাকা রোহিঙ্গারাও ভালো আছে।
পতাকা বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দেন মঞ্জুরুল হাসান খান ও মিয়ানমারের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দেন দেশটির সীমান্ত পুলিশের লেফটেন্যান্ট সোয়োজাই লিউ। গতকাল শুক্রবার সকালে বান্দরবান উপজলার ঘুমধুমের তুমব্রæ সীমান্তে নো-ম্যানস ল্যান্ড এলাকা পরিদর্শন করেছেন বান্দরবান জেলা প্রশাসক দীলিপ কুমার বণিক, ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মঞ্জুরুল হাসান খান, বান্দরবান লামা উপজেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুস সালাম, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএন সরয়ার কামাল প্রমুখ।
গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে আটটায় শূন্যরেখার আশ্রয়শিবিরের একেবারে কাছে (তুমব্রু সীমান্তের কোনারপাড়ায়) গিয়ে দেখা গেছে, ট্রাকে করে সীমান্তে সেনাসমাবেশ ঘটাচ্ছে মিয়ানমার। বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ওই সীমান্তে ১৪-১৫টি ট্রাকে আনা হয়েছে তিন শতাধিক সেনা। আগের দিন বৃহস্পতিবার সেখানে আনা হয়েছিল সাত-আটটি ট্রাকে করে আরো ২০০ সেনাসদস্য। বৃহস্পতিবার রাত ৯টা থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী থেমে থেমে গুলিবর্ষণ করতে থাকে।
মিয়ানমারের সেনাসদস্যরা জি-থ্রি, একে-৪৭, চায়নিজ রাইফেল, মেশিনগানসহ ভারী অস্ত্র নিয়ে পাহারা বসিয়েছে। ট্রাক থেকে আনা হয়েছে রকেটলঞ্চার, মর্টার। এসব মর্টার থেকে ৬০-৭০ মিলিমিটার দূরত্বে শেল নিক্ষেপ করা যাবে। পাহাড়ের চ‚ড়ায় পলিথিনের বেড়া দিয়ে তৈরি হয় একাধিক ছাউনি। পাহাড় খনন করে তৈরি হচ্ছে অসংখ্য বাংকার। সেখানে ভারী অস্ত্র নিয়ে পাহারা বসিয়েছে সেনাসদস্যরা। এসব পরিস্থিতি দেখে স্থানীয় লোকজন আতঙ্কিত। এই সৈন্য সমাবেশকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ সীমান্তে বিজিবি টহল জোরদার ও নজরদারি বাড়িয়েছে।
এদিকে তুমব্রæ সীমান্তের নো-ম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের দিকে ভারী অস্ত্রের পাশাপাশি হালকা অস্ত্র তাক করে রেখেছে বর্মী সেনারা। এর পাশাপাশি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় সকাল ১১টায় মাইকিং করে শূন্যরেখা থেকে রোহিঙ্গাদের সরে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে। এতে সীমান্তের জিরো লাইনে থাকা রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের মতো যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি সম্পূর্ণরূপে সীমান্তে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এসব মিলে শূন্যরেখায় অবস্থানরত রোহিঙ্গারা নিরাপদে থাকার লক্ষ্যে সতর্ক অবস্থায় থেকে টহল জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এ পরিস্থিতিতে দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারীদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে, তুমরু সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার পাশে আবারোও জনবল বৃদ্ধি করেছে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপি। গত ১ মার্চ থেকেই বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির তুমরু সীমান্তে জিরো পয়েন্টে ঢুকতে আবারো প্রস্তুতি নিয়েছে মিয়ানমারের সেনারা। তুমরু সীমান্তে ৭টি পয়েন্টে কাঁটাতারের বেড়া পার হতে মই বসিয়েছে তারা। মই দিয়ে রাতে জিরো পয়েন্টে ঢুকে হামলা চালানোর চেষ্টা করেছিল তারা। সেই সঙ্গে নো-ম্যান্স ল্যান্ড থেকে রোহিঙ্গাদের সরে যেতে এখনো মাইকিং অব্যাহত রেখেছে। কাঁটাতারে আবারো মই বসানোয় আতঙ্ক বিরাজ করছে নো-ম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মাঝে।
তুমব্রু সীমান্তে রোহিঙ্গারা জানান, আমরা সারারাত নির্ঘুম কাটিয়েছি। রাতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী কাঁটাতারে মই দিয়ে জিরো পয়েন্টে ঢোকার চেষ্টা করে।
শুক্রবার দুপুর থেকে আবারো সেই মই বসিয়েছে মিয়ানমার। সারারাত আতঙ্কে ছিলাম, এখনো ভয়ে আছি। মিয়ানমার সেনারা যেকোনো সময় আবারো জিরো পয়েন্টে ঢোকার চেষ্টা করতে পারে। এদিকে, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার অংশ থেকে গতকালও ফাঁকা গুলির শব্দ পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার দিনগত রাত ৩টার দিকে বেশ কয়েকটি ফাঁকা গুলির শব্দ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় সীমান্তে উত্তেজনা আরো বেড়েছে। সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির সদস্যরা।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

%d bloggers like this: