অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ৯ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৭ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরী

নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত, দুর্ভোগে বন্যার্তরা

Print

স্টাফ রিপোর্টার: উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে বন্যাদুর্গতদের দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে। পাশাপাশি নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে প্রতিদিন। কোথাও নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বাড়িঘর।
সুনামগঞ্জে পাহাড়ি ঢল আর বন্যায় প্রায় ১১ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। জেলা মৎস্য অফিসার সুলতান আহমদ জানান, সুনামগঞ্জের ১১টি উপজেলার ৯৭৩টি পুকুরের ৫১৬ মে.টন মাছ ভেসে গেছে। যার মূল্য ৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। পানি কমলে এর ক্ষতির পুরোপুরি নিরুপণ করা যাবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপপরিচালক জাহিদুল হক জানান, ১৮৭৩ হেক্টর জমির আউশ ধান, রোপা আমন ধান, বীজতলা ও সবজি ক্ষেতের ক্ষতি হয়েছে। সবজি ক্ষেত সম্পূর্ণ নষ্ট এবং বীজতলা, রোপা আমন ও আউশ ধান আংশিক নষ্ট হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার।
সরাইলে মেঘনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঢেউয়ের তোড়। উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের নদীর তীরবর্তী শত শত বাড়িঘর এখন হুমকির মুখে। একাধিক চাতাল মিল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভেঙে নদী গর্ভে চলে যাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে শাখাইতি গ্রামের ১৩টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
জামালপুরে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। যে কারণে জামালপুরের ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মেলান্দহ, সরিষাবাড়ী, বকশীগঞ্জ এবং মাদারগঞ্জ উপজেলার ৫০টি ইউনিয়নসহ ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ পৌরসভা বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। গত কয়েক দিনে বন্যার পানিতে ডুবে জেলায় ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সিরাজগঞ্জে পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতি হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি ১৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে শুক্রবার সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। এ নিয়ে জেলার মোট ৩৩টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে। প্রায় আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
কুড়িগ্রামে বন্যার ১২তম দিনে বানভাসির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৬ লাখে। পানিবন্দি মানুষের ভোগান্তি পৌঁছেছে চরমে। জেলার ৭৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫৭টি ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ বন্যার সঙ্গে লড়াই করছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল মোত্তালিব মোল্লা জানান, দুর্গম চরের মানুষ বন্যা ও বৃষ্টির মধ্যে অমানবিক জীবনযাপন করছে। সেই সঙ্গে দেখা দিয়েছে গবাদি পশুর খাদ্য ও পানিবাহিত রোগ। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজার রহমান জানান, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫৩ দশমিক ৩০ কিলোমিটার। বাঁধের ভাঙা অংশ নিয়ে পানি ঢুকে প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। জেলার ৯ উপজেলার ৫৭টি ইউনিয়নের ৭২৮টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বন্যায় ১ হাজার ১৮৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকা পানিতে ডুবে আছে।
গাইবান্ধা থেকে উত্তরাঞ্চল প্রতিনিধি জানান, ফুসে উঠেছে তিস্তা যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীসহ সবগুলো নদীর পানি। ফলে নতুন নতুন এলাকা ডুবে যাচ্ছে ঘণ্টায় ঘণ্টায়। চরাঞ্চলের প্রায় দুই লাখ পরিবার দীর্ঘদিন পানিবন্দি থেকে দুর্বিসহ জীবন যাপন করছে। গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, পানিতে ডুবে গেছে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার চার উপজেলার ১৬১টি চর এখন পানির নিচে। তারাপুর, হরিপুর, বেলকা, শ্রীপুর, কাপাসিয়া, কামারজানি, মোল্লারচর, এ্যাড়েন্ডাবাড়ি, ফজলুপুর, উড়িয়া, কঞ্চিপাড়া, ফুলছড়িসহ ৩৩টি ইউনিয়নের চারদিকে এখন শুধু পানি পানি। কিছু কিছু চরে টিনের চালা দেখা গেলেও কোনো মানুষ নেই।
জামালুপুরে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জামালপুরের ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মেলান্দহ, সরিষাবাড়ী এবং মাদারগঞ্জ উপজেলার ৫০টি ইউনিয়নসহ ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে গত বৃহস্পতিবার দুই শিশুসহ চারজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন- ইসলামপুর উপজেলার চিনাডুলী ইউনিয়নে সুদির নবদাসের স্ত্রী কমলিনী (৩৫), একই উপজেলার চরপুটিমারী ইউনিয়নের সোনাহারের মেয়ে ইয়াসমীন (২) ও মুনসের আলীর ছেলে রাকিব (২) এবং উপজেলার সাপধরী ইউনিয়নের মাহামুদ ফকিরের স্ত্রী হাওয়া খাতুন (৬০)। এ পর্যন্ত বন্যার পানিতে ডুবে গত কয়েক দিনে জেলায় ৭ জনের মৃত্যু হলো। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি ৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল শুক্রবার বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ১২১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় এ পর্যন্ত জেলায় ৫ লাখ ২৯ হাজার ২২০ জন মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। ভয়াবহ বন্যায় মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। চারদিকে বন্যার অথৈ পানিতে স্থবির হয়ে পড়েছে মানুষের জীবনযাত্রা। বন্যার কারণে চারদিকে পানি উঠায় রান্না করার সুযোগ না থাকায় অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে বানভাসি মানুষ। দুর্গত এলাকায় লোকজন দেখামাত্রই ত্রাণের আশায় ছুটে আসেন এসব দরিদ্র মানুষেরা। চিনাডুলি ইউনিয়নের ষাট-ঊর্ধ্ব আমেনা বেওয়া, মরিয়ম, আবদুল লতিফ, মোবারক আলী, কুলকান্দি গ্রামের আশি বছর বয়সের বৃদ্ধা গোলেছা ও ময়না বেগম অভিযোগ করে বলেন, আমাদের ঘরে ধান চাল থাকলেও রান্না করার সুযোগ নেই। তাই আমারা ছেলেমেয়ে নিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছি। বন্যার্দুগত এলাকায় গৃহপালিত পশু নিয়ে বানভাসি মানুষেরা বেশ বেকায়দার মধ্যে রয়েছেন। এ ছাড়াও বন্যাকবলিত এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানি ও গো-খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক বানভাসি মানুষ উঁচু বাঁধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাস্তার উপর আশ্রয় নিয়েছে। এদিকে বন্যার কারণে বিষাক্ত সাপের উপদ্রব বেড়ে গেছে। এরই মধ্যে সাপের কামড়ে মাদারগঞ্জ উপজেলার আদারভিটা ইউনিয়নের পোড়াবাড়ি এলাকায় মজনু (৩০) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।
সিরাজগঞ্জে সিরাজগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতি হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি ১৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে শুক্রবার সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে বইছে। পানি বৃদ্ধির ফলে নতুন করে আরো ২টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। এ নিয়ে জেলার মোট ৩৩টি ইউনিয়ন এখন বন্যাকবলিত হওয়ায় প্রায় আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এদিকে সিরাজগঞ্জ শহররক্ষা বিকল্প বাঁধে সিকেজ ও চৌহালী উপজেলার ঘোড়জান এলাকায় নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ হাসান ইমাম জানান, যমুনায় অব্যাহতভাবে পানি বৃদ্ধির কারণে বাঁধে প্রচÐ চাপ পড়েছে। যে কারণে সদর উপজেলার রানীগ্রামের শিমুলতলী এলাকায় বাঁধের কয়েকটি স্থান দিয়ে পানি সিকেজ করেছিল। বৃহস্পতিবার বিকালের মধ্যেই সেই সিকেজগুলো মেরামত করা হয়েছে। আরো কোথাও সিকেজ আছে কি-না তাও মনিটরিং করা হচ্ছে। এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারি জানান, যমুনার পানি বাড়তে থাকায় উপজেলার ঘোড়জান ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী কয়েকটি এলাকায় বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যেই এসব এলাকার কয়েকশ বাড়িঘর ও রাস্তা-ঘাট নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা ওয়ালি উদ্দিন জানান, সরকারি হিসাবে সিরাজগঞ্জ সদর, কাজিপুর, বেলকুচি, শাহজাদপুর ও চৌহালী উপজেলায় ৩৩টি ইউনিয়নের প্রায় শতাধিক গ্রামের কমপক্ষে সাড়ে ১০ হাজার পরিবারের লক্ষাধিক মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছেন পড়েছেন। এছাড়া ১২শ বাড়িঘর আংশিক ও পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার্তদের জন্য ১৩৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এ পর্যন্ত জেলার ৫টি উপজেলার বন্যাকবলিতদের মাঝে ২৫০ টন চাল ও ৬ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। আরো ত্রাণের জন্য আবেদন করা হয়েছে।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

%d bloggers like this: