অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১২ই সফর, ১৪৪৩ হিজরী

পাল্টে গেছে যানজটের ধরন

Print

বিশেষ প্রতিনিধি : নগরে বসবাসকারী প্রত্যেক নাগরিকের ধারণা ছিল শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটি থাকায় রাস্তায় যানজট কম থাকবে। বর্তমানে এর সঙ্গে যানজটের কোনো মিল নেই। বরং শুক্র-শনি সরকারি ছুটি থাকায় বিনোদন কেন্দ্রেগুলোয় যেমন ভিড় বাড়ছে তেমনি বিভিন্ন চাকরির ভর্তি পরীক্ষায় এ দুদিন রাস্তায় সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। সপ্তাহের কোনোদিনই যানজট থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না নগরবাসী। যানজট নিয়ন্ত্রণে রাজধানীতে ফ্লাইওভার নির্মাণ করলেও সমাধান মিলছে না। সেজন্য এবার ফ্লাইওভার ফর্মুলার পরিবর্তে মেট্রোরেল ফর্মুলার দিকে এগিয়ে চলছে সরকার। নতুন ফর্মুলায় বর্তমানে এক লেনের মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ চলছে। একইসঙ্গে বাকি পাঁচ লেনের মেট্রোরেল নির্মাণকাজ শুরু করা জরুরি বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। ৬ লেনের মেট্রোরেল হলে নগরবাসী কিছুটা হলেও যানজট থেকে মুক্তি পাবে। আর এক লেন হওয়ায় শুরুতেই জনগণের চাপ বেড়ে যাবে বলে মনে করেন তারা।
জানা যায়, ২২ হাজার কোটি টাকার মেট্রোরেল প্রকল্পে অর্থায়ন করছে জাইকা ও বাংলাদেশ সরকার। জাইকা দেবে ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন হচ্ছে ৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। প্রায় ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল প্রকল্পে থাকবে ১৬টি স্টেশন। নকশা অনুযায়ী প্রায় ১৮০ মিটার লম্বা হবে প্রত্যেকটি স্টেশন। এসব স্টেশন নির্মাণ হবে দোতলার মতো। নিচ তলায় থাকবে টিকেট কাউন্টার। স্টেশনের দুপাশে যাত্রীরা আসা-যাওয়া করতে পারবেন। মেট্রোরেলের চলতি কাজের মধ্যে প্যাকেজ ৩ ও ৪-এর আওতায় উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত নির্মাণ হচ্ছে ৯টি স্টেশন। এজন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ২৩০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
স্টেশনগুলো হচ্ছেÑ উত্তরা উত্তর-দক্ষিণ, মিরপুর, পল্লবী, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কাওরানবাজার, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, তোপখানা রোড, সচিবালয় ও মতিঝিল।
সরেজমিন দেখা যায়, মহাখালী ফ্লাইওভার শুধু রেল লাইনের সিগনাল ক্রসিংয়ের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। ফ্লাইওভার থেকে নিচের রাস্তা পর্যন্ত তৈরি হয়েছে যানজট। মৌচাক ফ্লাইওভার থেকে বাস নামতেই রাজারবাগ, শান্তিনগর, মালিবাগ, ওয়্যারলেস গেইট ও বাংলামোটরে যানজটে বাসগুলো থমকে আছে। নগরবাসী ট্যাক্স দিলেও সিটি কর্পোরেশন শুধু রাস্তার নির্মাণকাজের দায়িত্ব পালন করে। নাগরিকসেবা প্রদান করার জন্য যানজট দূর করা বা গণপরিবহণের যাত্রীসেবার দায়িত্ব কেউই নিতে চায় নাÑ এমন অভিযোগ নগরবাসীর।
এমনই একজন ভুক্তভোগী আব্দুল আজিজ। বেসরকারি এই চাকরিজীবী থাকেন উত্তরা হাউজ বিল্ডিংয়ে। চাকরি করেন বাংলামোটরে। তার সাপ্তাহিক ছুটি রোববার হওয়ায় শুক্র ও শনিবার অফিস করেন। এ দুদিনেও যানজটের মুখোমুখি হচ্ছেন তিনি। প্রতিদিন অফিসে পৌঁছতে প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা সময় লাগে। তিনি বলেন, যানজটের কারণে প্রতিদিন ৪ ঘণ্টা হাতে রেখে বাড়ি থেকে বের হতে হয়। রাস্তায় যানজটের কারণে প্রত্যেক দিন সাড়ে ৩ ঘণ্টা জীবন থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শুধু তিনি নন, এ রকম হাজারো আব্দুল আজিজের জীবন থেকে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো যানজটের কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, যানজট নিরসনে রাজধানীতে প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা কমাতে হবে। এমন আইন করতে হবে একটি পরিবারের জন্য একটার বেশি প্রাইভেট গাড়ি নয়। তাদের একটির বেশি গাড়ি রাস্তায় বের হওয়া মাত্রই অতিরিক্ত চার্জের ব্যবস্থা করতে হবে। তখন দেখা যাবে নগরীতে প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা কমে যাবে। সেই সঙ্গে গণপরিবহণের সংখ্যা বাড়াতে হবে। সিঙ্গাপুরের উদাহরণ দিয়ে এ নগর পরিকল্পনাবিদ আরো বলেন, সিঙ্গাপুরে আগে যানজট লেগেই থাকতো। বর্তমানে সিঙ্গাপুরে মেট্রোরেল ব্যবস্থা করায় যানজট নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কারণ মেট্রোরেলে সহজেই যাতায়াত করা যায়। খরচও কম।
বর্তমানে মেট্রোরেলের জন্য এক লেনের নির্মাণকাজ চলছে। যতো দ্রæত সম্ভব বাকি ৫টি লেনের কাজ শুরু করতে হবে। রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণে মেট্রোরেলের বিকল্প নেই। ঢাকা শহরের রাস্তার পরিধি এমনিতেই কম, সেজন্য রাস্তার ওপর পার্কিংয়ের অনুমোদন দেওয়া সম্ভব নয়। রাস্তায় পার্কিংয়ের বিষয়টি শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ফুটপাতে পথচারীদের চলাচলের জন্য হকার উচ্ছেদও জরুরি।
জানা গেছে, ২০২০ সালের মধ্যে মিরপুর থেকে মতিঝিল (বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন) পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য ঠিক করা হলেও প্রথম পর্যায়ে ২০১৯ সালের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ শেষ হবে। এ লক্ষ্যে মেট্রোরেলের একটি লেনের (মেট্রোরেল রুট-৬) কাজ এগিয়ে চলছে। দিন-রাত পরিশ্রম করে মেট্রোরেলের কাঠামো দাঁড় করানো হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, বিশ্বে মেট্রোরেলের যাত্রা শুরু হয় ১৮৬৩ সালে। দেরিতে হলেও বাংলাদেশ মেট্রোরেলের পথে হাঁটছে। ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেট্রোরেলের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। আর গত বছরের ২৬ জুন মেট্রোরেল প্রকল্পের লাইন ৬-এর নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। ২০১২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় সরকার। তারপর থেকে নানা প্রতিক‚লতার মধ্যে ধীরে ধীরে সামনের দিকে অগ্রসর হয় এমআরটি প্রকল্পের কাজ।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

%d bloggers like this: