অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১১ই সফর, ১৪৪৩ হিজরী

ফের চিকুনগুনিয়া আতঙ্ক: সিটি করপোরেশন উদাসীন

Print

বিশেষ প্রতিনিধি: আবারও নগরবাসীর কাছে বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মশা। ঘর, স্কুল, হাসপাতাল, অফিস থেকে শুরু করে বিমানের ভেতর পর্যন্ত মশার জ্বালায় অতিষ্ঠ মানুষ। নর্দমা, ড্রেন ও খালের নোংরা পানির উপরে জন্ম নেওয়া মশা নিধনে দুই সিটি করপোরেশন, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কয়েল ও মশার ঝাঁলিয়ে নগরবাসী দীনাতিপাত করলেও ডেঙ্গু মশা নিয়ে ইতোমধ্যেই আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। ডেঙ্গু মশা নিধনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শেখ সালাউদ্দিন বলেন, চিকুনগুনিয়া রোগটি এডিস মশার কামড় থেকেই হয়। এডিস মশা নর্দমা, ড্রেন কিংবা খালে জন্মায় না। এসব মশা বাসাবাড়ির ছাদের উপর ফুলের টব, ফ্রিজ, সানশেডের স্বচ্ছ পানিতে জন্মায়। এ জন্য প্রতিনিয়ত এসব পানি পরিষ্কার করতে হবে। এখানে সিটি করপোরেশন কিছু করতে পারবে না। সিটি করপোরেশন অন্যের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ওষুধ দিতে পারে না। এডিস মশা সম্পর্কে নগরবাসীর প্রত্যেকে সচেতন থাকতে হবে। এদিকে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সিটি করপোরেশন নগর পিতার দায়িত্ব পালন করে। নগরের নাগরিক কীভাবে ভালো থাকবে সেটি তাদের দায়িত্ব। এক্ষেত্রে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন অন্যের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ওষুধ দিতে না পারলেও এক্ষেত্রে তারা (সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা) গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখতে পারেন। নগরবাসীকে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার কারণ সম্পর্কে আগেই জনসচেতনামূলক ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। উদাহরণ হিসেবে- জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যতটা না ভ‚মিকা রেখেছে এরচেয়ে বড় ভ‚মিকা রেখেছে প্রচারণায়। গত বছর হঠাৎ চিকুনগুনিয়া জ্বরে হাজার হাজার মানুষ ভুগেছেন। এবারও যদি এডিস মশা নিধনে সঠিক পদ্ধতি অবলম্ব করা না হয় তা হলে চিকুনগুনিয়া মহামারী আকার ধারণ করবে। এডিস মশা চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু বাহক, তাই দুই রোগ একসঙ্গেও দেখা দিতে পারে। তখন পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। হাজারীবাগ ট্যানারি এলাকার বাসিন্দা আবু বক্কর সিদ্দিকের মতে, গত বছরের তুলনায় এবার মশার উপদ্রব বেশি। মশার কাছ থেকে রক্ষা পেতে দিনের বেলাও ঘরে কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হয়। সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের ঘরে মশার রাজত্ব বেড়ে যায়। কখনো কখনো মনে হয়- মশার কামড় থেকে রক্ষা পেতে নিজের ঘর ছেড়ে বাইরে বের হয়ে যাই। রাতে ঘরের ভেতর কয়েল জ্বলে, ফ্যান চলে কিন্তু মশার কামড় থেকে রক্ষা নেই। মশা থেকে রক্ষা পেতে মশারি টাঙিয়েও লাভ হয় না। কিভাবে যে মশা মশারির ভেতরে ঢুকে তা বোঝা মুশকিল। মশারির ভেতরেও মশার কামড়ে শান্তিমত ঘুমানো যায় না। এরসঙ্গে চিকুনগুনিয়ার আতঙ্ক রয়েই গেছে। গত বছরের তুলনায় এবার চিকুনগুনিয়া জ্বর বেশি হবে। চিকুনগুনিয়া নিয়ে ইতোমধ্যেই আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। একই কথা চকবাজার ৯ নম্বর দেবীদাস ঘাট লেনের বাসিন্দা ফিরোজ কবিরের। তিনি বলেন, নর্দমা, ড্রেন ও খালের নোংরা পানির উপরে জন্ম নেওয়া মশা নিধনে সিটি করপোরেশন সোচ্চার থাকলেও এডিস মশা নিধনে কর্মপরিকল্পনা নেই। এতে নগরবাসীর ভেতর বেশি আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। এডিস মশা নিধনের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের নাকি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এ নিয়েও রয়েছে দ্ব›দ্ব। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছিলেন, চিকুনগুনিয়া হচ্ছে একটি ভাইরাস। এডিস মশা থেকে এর উৎপত্তি হয়। এ মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। এ দায়িত্ব কোনোভাবেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নয়। এদিকে প্রয়াত মেয়র আনিসুল রহমান বলেছিলেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কোনো জাতীয় নির্দেশিকা প্রস্তুত করা হয়নি। এটা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তৈরি করে। যে কারণে প্রথমে এ রোগের নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। অনেকেই মনে করেন, এ জন্য ডিএনসিসি দায়ী। মূলত এডিস মশার কামড়ে চিকুনগুনিয়া হওয়ায় সিটি করপোরেশন দায়ী নয়। এ ব্যাপারে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাকির হাসানের সঙ্গে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে উত্তর সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ কোনো পরিকল্পণা নেই। এডিস মশা নিয়ে নগরবাসী নিজেদেরকেই সচেতন থাকতে হবে। অবশ্য দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন গতকাল বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের বকুলতলায় মশা নিধনে করপোরেশনের নিয়মিত ফগিং এর পাশাপাশি দুই সপ্তাহ জুড়ে বিশেষ ক্র্যাশ পোগ্রামের উদ্বাধনকালে বলেছেন, চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি করপোরেশনের কর্মকাÐের পাশাপাশি বাসা-বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নিজেদেরই রাখতে হবে। এ দিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊধ্বর্তন এক কর্মকর্তা জানান, এডিস মশা হোক আর যে মশাই হোক তা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কখনই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হতে পারে না। সকল মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের।
জানা গেছে, পৃথিবীতে ৩ হাজার ৫০০ এর বেশি প্রজাতির মশা পাওয়া গেছে। সুযোগ পেলেই এসব মশা মানুষকে কমড়ায়। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষের শরীরে রোগজীবাণু সংক্রমণের চলক হিসেবে কাজ করে মশা। তবে মশার কোনো দাঁত নেই। তাদের মুখের সামনের অংশ বরাবর প্রোবোসকিস নামক শুঁড়ের মতো থাকে যার সাহায্যেই রক্ত খেতে পারে। আবার রক্ত খেয়ে স্ত্রী মশারা ডিম পাড়তে বসে। একটি স্ত্রী মশা একসঙ্গে ৩০০টি ডিম পাড়ে এবং কোথাও জমে থাকা পানিই হলো তাদের ডিম পাড়ার উপযুক্ত স্থান। ন্যূনতম ১০ দিন পানিতে থাকার পরই কেবল ডিম ফুটে বাচ্চা মশার আবির্ভাব ঘটে। একটি স্ত্রী মশা কখনো কখনো ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত বাঁচে এবং উপযুক্ত অবস্থায় তারা প্রতি তিনদিন অন্তর অন্তর ডিম পাড়তে পারে।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

%d bloggers like this: