অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ৭ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২২শে মহররম, ১৪৪১ হিজরী

বাকশাল কার্যকর থাকলে নির্বাচন নিয়ে কোন বিতর্ক থাকতো না: প্রধানমন্ত্রী

Print

দৈনিক চিত্র প্রতিবেদক:
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রবর্তিত শাসন ব্যবস্থা (বাকশাল) কার্যকর থাকলে নির্বাচন নিয়ে কোনও বিতর্ক থাকতো না। বাকশাল ছিল সর্বোত্তম পন্থা-উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধু যে পদ্ধতিটা (বাকশাল) করে গিয়েছিলেন সেটা যদি কার্যকর করতে পারতেন তাহলে এসব (নির্বাচনী অস্বচ্ছতা) প্রশ্ন আর উঠতো না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৯তম জন্মবার্ষিকী, জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে সোমবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, আর যেন বাংলার মাটিতে খুনী-সন্ত্রাসী, যুদ্ধাপরাধী-স্বাধীনতাবিরোধী, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাকারী, এতিমের অর্থ আত্মসাতকারীরা ক্ষমতায় আসতে না পারে। আর যেন তারা দেশের মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে। এ ব্যাপারে সবার সতর্ক থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা মানেই বঙ্গবন্ধু। তাই ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ব্যাপকভাবে বঙ্গবন্ধুর জন্ম শততমবার্ষিকী ২০২০-২০২১ ‘মুজিব বর্ষ’ পালনে এখন থেকেই সবাইকে প্রস্তুতি নিতে হবে। তিনি বলেন, জাতির পিতা আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন। আমরা বাংলাদেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলবো। ইনশাল্লাহ আমরাই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পুরন করতে পারবো। অবৈধ ক্ষমতাকে বৈধ করতে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল জিয়াউর রহমানই বাংলাদেশে প্রথম নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছিল অভিযোগ করে শেখ হাসিনা বলেন, এখন নির্বাচন নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলেন। অথচ স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুই নির্বাচন নিয়ে এমন এক পদ্ধতি চালু করেছিলেন, যাতে প্রার্থীরা খুব কম খরচে নির্বাচন করতে পারেন, তৃণমুলের জনপ্রিয় নেতারাই যেন নির্বাচিত হতে পারেন পারেন সেই ব্যবস্থা করেছিলেন। ওই পদ্ধতিতে ছিল সরকারি খরচে একটিমাত্র পোস্টার হবে, সেখানে সব প্রার্থীর ছবি ও মার্কা থাকবে। নির্বাচন অর্থ ও লাঠির কাছে জিম্মি না হয় সেই জন্যই এ পদ্ধতি চালু করেছিলেন। এ পদ্ধতিতে দুটি নির্বাচনও হয়েছিল। যদি জাতির পিতা নির্বাচনের এই পদ্ধতি কার্যকর করে যেতে পারতেন তবে মাঠের জনপ্রিয় নেতারাই নির্বাচিত হতে পারতেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী সামরিক স্বৈরাচারের আমলে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, ৭৫ পরবর্তী সংবিধান লংঘন করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে নির্বাচনী ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে দেয় জেনারেল জিয়া। হ্যাঁ-না ভোট, রাষ্ট্রপতি ভোটের নামে অবৈধভাবে ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট বিলিয়ে গঠিত দলকে দুই তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী দেখানো হয়। কারণ সংবিধান সংশোধন করে জেনারেল জিয়া অবৈধ ক্ষমতা বৈধ করতে ওই এক তৃতীয়াংশ আসনেরই প্রয়োজন ছিল। বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে ভাওতাবাজীর দিয়ে মূলত জিয়াউর রহমান কারফিউ গণতন্ত্র দিয়েছিল। আর জেনারেল জিয়ার ক্ষমতা দখলপরে জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে পরবর্তী জেনারেল এরশাদ ও খালেদা জিয়ার আমলেও এসব করা হয়। আর সামরিক স্বৈরাচারের আমলেই ঋণখেলাপী সংস্কৃতি, ঘুষ, দুর্নীতি ও ছাত্রদের হাতে অস্ত্র-মাদক তুলে দিয়ে বিপথে ধাবিত করা হয়। এই ধারা ৯৬ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনকারীদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচন নিয়ে কেউ কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনি। ওই নির্বাচনে শতকরা ৮৪ ভাগ ভোট পড়েছিল। বিএনপি ওই নির্বাচনে মাত্র ২৮টি আসন পেয়েছিল। আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশ আসনে মেজোরিটি পেয়ে সরকার গঠন করে। ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি-জামায়াত জোট ঠেকাতে চেয়েছিল, কিন্তু জনগণের তাদের প্রতিহত করেছিল। আর ২০১৮ সালের নির্বাচনের সার্ভে রিপোর্ট অনুযায়ী, এক দশক ধরে আওয়ামী লীগ ধারাবাহিকভাবে দেশে যে অসামান্য উন্নতি করেছে, অর্থনীতি স্বাবলম্বি হয়েছে, প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, তৃণমুল পর্যন্ত জনগণ উন্নয়নের সুফল ভোগ করছে, জঙ্গীবাদ-সন্ত্রান দমনে সরকার দৃঢ়ভাবে কাজ করেছে বলেই দেশের জনগণ বিপুল ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করেছে।
যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে বিএনপি এবারও নির্বাচনে গেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে জিতলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, তা তারা (বিএনপি-জামায়াত-ঐক্যফ্রন্ট) দেখাতে পারেননি। কারণ হত্যা-দুর্নীতির কারণে তাদের নেতারা জেলে কিংবা বিদেশে পলাতক। নির্বাচনে ৮০ ভাগ ভোট পড়েছে। বিপুল ভোটে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছে। এবারের নির্বাচনে জামায়াত একটি আসনও পায়নি। নির্বাচনে তিনশ’ আসনের বিপরীতে যারা (বিএনপি-জামায়াত-ঐক্যফ্রন্ট) ৮শ প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়, তারা নির্বাচনে ভোট পাবে কী করে?
প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের কথা তুলে ধরতে গিয়ে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা বলেন, খোকা নামের সেই ছোট্ট শিশুটির (বঙ্গবন্ধু) নাম আজ সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। তার একটিই কারণ, তিনি (বঙ্গবন্ধু) একটি জাতীকে বন্দী দশা থেকে মুক্ত করেছেন। গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে একটি দেশকে স্বাধীন করেছেন। তিনি বলেন, ছোট বেলা থেকেই বঙ্গবন্ধুর একটিই লক্ষ্য ছিল গরীব, দুঃখী, মেহনতি মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। আর এ লক্ষ্য অর্জনেই বঙ্গবন্ধু আজীবন লড়াই-সংগ্রাম করেছেন, নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য বাঙালি জাতিকে সাহসী করে তুলেছিলেন। মহান ভাষা আন্দোলনে জাতির বঙ্গবন্ধুর অপরিসীম অবদানের কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, কেবল মহান মুক্তিযুদ্ধই নয়, ভাষা আন্দোলনেও জাতির জনক অসামান্য অবদান রেখেছেন। হাতেগোনা দুয়েকজন সে অবদানের কথা বললেও অনেকেই সেসব কথা বলতেন না। ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর যে অবদান, একসময় সে ইতিহাস হারিয়ে গিয়েছিল। অনেক জ্ঞানী-গুণী মানুষও উল্লেখ করতেন না তাঁর অবদান। ১৯৪৮ সালে বঙ্গবন্ধু যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন, তখন থেকেই বঙ্গবন্ধু ভাষার জন্য আন্দোলন শুরু করেন। ওই বছরই তিনি ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেফতার হন। তাঁর এসব অবদানের কথা অনেকেই জানতেন, কিন্তু লিখতেন না, বলতেন না। তিনি বলেন, জাতির পিতার অবদানের এসব তথ্য একসময় মুছে দেওয়া হয়েছিল। জাতির পিতার বিরুদ্ধে পাকিস্তানী গোয়েন্দা বাহিনী ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত যেসব রিপোর্ট করে, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর আমি সেসব রিপোর্ট সংগ্রহ করেছিলাম। সেসব গোয়েন্দা রিপোর্টেই ভাষা আন্দোলনে জাতির পিতা কী করেছিলেন, সেসব তথ্য সংগ্রহ করি। তখন আমি ভাষা আন্দোলন নিয়ে অনেক বক্তব্য দেই। অনেকেই তখন আমার বিরুদ্ধে লেখা লিখেছিলেন। তারা বলেন, আমি নাকি তথ্য আবিষ্কার করেছি। কিন্তু আজ সেই সত্য প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ ও বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নথি- এগুলো একে একে প্রকাশ করতে শুরু করেছি। এরই মধ্যে দুই খন্ডে গোয়েন্দা নথি বের হয়েছে। এর মধ্যে দ্বিতীয় খন্ডে রয়েছে ১৯৫২ সালে জাতির পিতা যেসব কাজ করেছেন, সেগুলোর কথা। তিনি জেলখানায় থেকেই কিভাবে যোগাযোগ করেছেন, কিভাবে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন, এমন সব তথ্য পাওয়া যাবে এই খন্ডে। এরপর ১৯৫৩ সালের রিপোর্ট নিয়ে আরও এক খন্ড বের হবে। তিনি কিভাবে আন্দোলন করেছেন, সে বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যাবে এই খন্ডে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলাম, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা, গাজীপুর সিটি কর্পোারেশনের সাবেক মেয়র আজমত উল্লাহ খান, ত্রাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান ও দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.