অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ১৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১২ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী

বেপরোয়া প্রশ্নফাঁসচক্র

Print

নিজস্ব প্রতিবেদক : আধুনিক প্রযুক্তিতে দেশ যতই এগিয়ে যাচ্ছে। অপরাধীরাও ততই ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করে অপরাধের ঘটনা ঘটাচ্ছে। আর এজন্যই প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। দেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ একই ধারণা করছেন। দেশের সর্বত্র এখন প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় তীব্র সমালোচনা ও শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগের দাবি উঠছে।
অপরদিকে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী কাজী কেরামত আলী ‘প্রশ্নফাঁস হয়নি, আগামী বছর থেকে আর ফাঁস হবে না, এমসিকিউ বাদ দেয়া হবে’ এভাবে একেক সময় একেক কথা বলে আসছেন। এমনই পরিস্থিতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ সোহরাব হোসেন ‘বই খুলে’ পরীক্ষা নেয়ার নতুন আইডিয়া প্রকাশ করেছেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসে সারাদেশের ঝড় না থামার আগেই সর্বশেষ মঙ্গলবার আবারো এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার সব প্রশ্নই ফাঁস হলো। অতীতে কোনো বছরই এমনটি ঘটেনি। আর এসব ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নামছে ছাত্ররা।
গতকাল দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় জড়িত রাজধানী ঢাকায় আবারো একজন শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার হয়েছে। এছাড়া দশজন শিক্ষককে আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছে। আর রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে সাভারে এসএসসি পরীক্ষায় নকলসহ ধরা পড়ায় এক শিক্ষার্থী কেন্দ্রের ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে লাফ দিয়ে পড়েছে। এতে গুরুতর আহত হয়েছে সে।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে সাভারের অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনায় আহত ওই পরীক্ষার্থীকে চিকিৎসার জন্য সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। তার বাড়ি সাভার পৌর এলাকার ব্যাংক কলোনি এলাকায়। সে সাভার উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলে জানা গেছে।
সাভারের অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে দায়িত্বরত কর্মকর্তা (উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা) মো. মেজবাহ উদ্দিন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মেয়েটি তার বাম হাতে লিখে আনা প্রশ্নোত্তর দেখে দেখে লিখছিল। এ বিষয়টি টের পেয়ে তার খাতা নিয়ে নেওয়া হয়। এরপর সে জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, যে তার এক বন্ধু রাতে কুষ্টিয়া থেকে এ উত্তর লিখে পাঠিয়েছে, যা প্রশ্নের সঙ্গে মিলে গেছে।
তিনি আরো বলেন, খাতা নিয়ে নেওয়ার পরই সে ক্লাস থেকে বেরিয়ে দোতলা থেকে নিচে লাফ দেয়। এতে সে গুরুতর আহত হয়। পরে তাকে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। হাসপাতালের ইনডোর মেডিকেল অফিসার সাবিহা সুলতানা জানিয়েছেন, মেয়েটি পায়ে ও কোমরে আঘাত পেয়েছে। সে দাঁড়াতে এবং বসতে পারছে না।
সাভার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোসাম্মত কামরুন্নাহার বলেন, ওই ছাত্রীর এখন আর পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ নেই। যেহেতু তার হাতে নকল পাওয়া গেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ রাসেল হাসান বলেন, ওই ছাত্রীর হাতের মধ্যে লেখা থেকে নকল করার সময় হাতেনাতে ধরে ফেলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তখন তাকে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া চলছিল। এরই মধ্যে সে লাফিয়ে নিচে পড়ে যায়। ইতোমধ্যে ওই ছাত্রীকে বহিষ্কার করে বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
অপরদিকে পরীক্ষার আগে পদার্থবিদ্যা বিষয়ের প্রশ্নপত্র পাওয়ার ঘটনায় চট্টগ্রম আইডিয়াল স্কুল পটিয়া শাখার এক শিক্ষকসহ ১০ শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় ২৪ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়। মঙ্গলবার সকালে পটিয়া উপজেলা থেকে নগরীর কোতোয়ালি থানাধীন বাংলাদেশ মহিলা সমিতি স্কুলকেন্দ্রে আসার সময় এ ঘটনা ঘটে। জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। জেলা প্রশাসক জানান, ‘বাসে থাকা ৫৬ শিক্ষার্থীর মধ্যে সায়েন্স বিভাগের ২৪ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আর বাকি ৩২ জনের মধ্যে ৩০ জন কমার্সের ছাত্র ও দুইজন ভিন্ন স্কুলের হওয়ায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই ২৪ জনের মধ্যে ৯ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭ জনের কাছে মোবাইল ও ট্যাব পাওয়া যায়। আর বাকি দুইজন প্রশ্নপত্র পাওয়ার কথা স্বীকার করেছে। ওই বাসে থাকা আইডিয়াল স্কুলের পটিয়া শাখার শিক্ষক কোহিনুর আক্তারকেও আটক করা হয়েছে।’
এ ঘটনার পর শিক্ষা বোর্ডের সচিব শওকত আলম পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শনে এসে বলেন, ‘ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র পাওয়ার ঘটনায় জড়িত থাকায় ২৪ শক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আর বাসে করে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র নিয়ে পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিল শিক্ষার্থীরা। এর আগে, পদার্থবিদ্যা বিষয়ের প্রশ্নপত্র পাওয়ায় চট্টগ্রাম আইডিয়াল স্কুলের ৫৬ শিক্ষার্থীকে নজরদারিতে রাখে প্রশাসন। গতকাল মঙ্গলবার সকালে পটিয়া উপজেলা থেকে নগরীর কোতোয়ালি থানাধীন বাংলাদেশ মহিলা সমিতি স্কুলকেন্দ্রে আসার সময় তাদের আটক করে পুলিশ। তবে গতকালের পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) বলেন, পরীক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম আইডিয়াল স্কুলের পটিয়া শাখার শিক্ষার্থী। তারা শ্যামলী পরিবহনের একটি বাসে করে পরীক্ষাকেন্দ্রে আসছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বাসের শিক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্নপত্র থাকার বিষয়টি জানা যায়। এরপর সকাল সোয়া ৯টার দিকে বাসে তল্লাশি চাল্লায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোরাদ আলীর নেতৃত্বে একটি টিম। এ সময় ওই বাসে থাকা ৭-৮ জন শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোনে প্রশ্নপত্র পাওয়া যায়। ওই প্রশ্নপত্রের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মিল পাওয়া যায়।
এদিকে এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে সাব্বির আহমেদ (১৯) নামে একজনকে আটক করেছে র‌্যাব-২। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁও তালতলা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। র‌্যাব ২-এর অপারেশন অফিসার এএসপি ফিরোজ কাউসার সাংবাদিকদের জানান, আটক সাব্বির ধামরাই এলাকার একটি সরকারি কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। সে তালতলা এলাকার বাসিন্দা। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসএসসির প্রশ্ন সরবরাহ করে বিকাশের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতো সাব্বির। তার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
তাছাড়া, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় এসএসসি পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্বে অবহেলার দায়ে ১০ শিক্ষককে আজীবনের জন্য পরীক্ষাকেন্দ্রের দায়িত্ব থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার কোটালীপাড়া উপজেলার বলিহার ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসাকেন্দ্র থেকে তাদের বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কৃত শিক্ষকরা হলেনÑ প্রশান্ত বাড়ৈ, মনিরা খানম, মনির হাওলাদার, কবিতা কির্তনীয়া, অশোক জয়ধর, শামীম আহম্মেদ, মোহসিন তালুকদার, লায়েকউজ্জামান, নিয়াজ মকদুম ও জয় প্রকাশ বিশ্বাস।
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিলাল হোসেন বলেন, ওই পরীক্ষাকেন্দ্রে ১০২, ১০৩ ও ১০৪ নম্বর রুমে পদার্থবিজ্ঞান, ফিনান্স ও ব্যাকিং এবং বিশ্ব সভ্যতা পরীক্ষায় পাশাপাশি বসা পরীক্ষার্থীদের একই সেটের প্রশ্নপত্র দেয়া হয়। কিন্তু পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে বিষয়টি আমার নজরে আসে। পরে বিষয়টি কেন্দ্র সচিবকে জানানো হলে তিনি ওই তিন রুমে দায়িত্বরত শিক্ষকদের আজীবনের জন্য বহিষ্কার করেন। পরীক্ষাকেন্দ্রের সচিব ও কোটালীপাড়া পাবলিক ইউস্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক সুরেশ দাস বলেন, শিক্ষকদের দায়িত্ব ছিল খাতা স্বাক্ষরের সময় খাতা ও প্রশ্নগুলো মিলিয়ে দেখা। যা তারা করেননি। ওই ১০ শিক্ষককে বহিষ্কারের পর কেন্দ্রগুলোতে নতুন শিক্ষকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।
সূত্র জানায়, প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে বিটিআরসির নির্দেশনা অনুযায়ী পরীক্ষা শুরুর সময় মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হলেও তার আগেই ইন্টারনেটে বিভিন্ন ফেসবুক ও মেসেঞ্জার গ্রæপে চলে এসেছে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র। গত রোববার ছিলো এসএসসির ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’ বিষয়ের পরীক্ষা। সকাল ১০টায় ওই পরীক্ষা শুরুর এক ঘণ্টা আগে সকাল ৮টা ৫৯ মিনিটে ‘ওহেলপিং হ্যান্ড’ নামে একটি মেসেঞ্জার গ্রæপ থেকে উত্তরসহ ‘গ’ সেটের বহুনির্বাচনী প্রশ্ন দেওয়া হয়। আর আধা ঘণ্টার মধ্যে ওই একই প্রশ্ন ও উত্তরের ছবি বিভিন্ন গ্রæপ ও পেজে ছড়িয়ে পড়ে। পরীক্ষা শেষে ভাইরাল হওয়া প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষায় আসা প্রশ্ন হুবহু মিলে যায়।
ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তপন কুমার সরকার গণমাধ্যমকে বলেন, গত ১ ফেব্রæয়ারি এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়। সেদিনই প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এরপর থেকে প্রতিটা পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস হয়। এ অভিযোগে রাজধানীসহ সারাদেশে পরীক্ষার্থী, শিক্ষকসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর আগেও বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর পাওয়া যায়।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

%d bloggers like this: