অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২রা জিলক্বদ, ১৪৪২ হিজরী

মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে অবমাননার শাস্তি যাবজ্জীবন

Print

অনলাইন ডেস্ক: ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আদালত কর্তৃক মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত মীমাংসিত কোনো বিষয় এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রচারণা বা প্রোপাগান্ডা চালালে বা অবমাননা করলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেয়া হবে। গতকাল সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৬-এর খসড়ায় এসব কথা বলা হয়েছে। মন্ত্রিসভা আইনের খসড়া প্রাথমিক অনুমোদন দিয়ে সেটি আরো পর্যালোচনা ও পরীক্ষা করতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে দায়িত্ব দিয়েছে। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম প্রেস ব্রিফিংয়ে আইনটি অনুমোদনের কথা জানিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আইনটির প্রাথমিক অনুমোদন হওয়ার কারণ হচ্ছে অন্যান্য আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করা। এছাড়া, বিভিন্ন অপরাধের জন্য শাস্তির যে মাত্রা প্রস্তাব করা হয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা করে দেখা। তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি ইলেকট্রনিক মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা আদালত কর্তৃক মীমাংসিত মুক্তিযুদ্ধের বিষয়াবলী বা জাতির পিতার বিরুদ্ধে যে কোনো প্রচার-প্রপাগান্ডা বা তাতে মদত দিলে শাস্তি সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড, সর্বনিম্ন ৩ বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এছাড়া, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের জন্য সর্বোচ্চ ২ বছর ও সর্বনিম্ন ২ মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে খসড়া আইনে। এ বিষয়ে শফিউল আলম বলেন, ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে মানহানি, মিথ্যা, অশ্লীল, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত-এ জাতীয় কোনো অপরাধ ঘটালে সর্বোচ্চ ২ বছর ও সর্বনিম্ন ২ মাসের কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে আইনে। এছাড়া সাইবার সন্ত্রাস ও সাইবার অবকাঠামো সংক্রান্ত অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১৪ ও সর্বনিম্ন ২ বছরের কারাদন্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান খসড়া আইনে রয়েছে। আইনটি প্রাথমিকভাবে নীতিগত অনুমোদন দেয়া হলেও আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইনমন্ত্রীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে জানিয়ে শফিউল আলম বলেন, যারা কনসার্ন স্টেকহোল্ডার (সংশ্লিষ্ট সুবিধাভোগী) তাদের নিয়ে বৈঠক করে এটাকে (খসড়া আইন) আরেকটু পরিশীলিত করবেন। কারণ আইনটি ডাক ও টেলিযোগাযোগ, তথ্য মন্ত্রণালয় এবং আরো অনেকগুলো মিনিস্ট্রির বিষয়। এখানে ওভারল্যাপিং আছে, এ জন্য আইনটি পরিমার্জনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আইনে সাইবার অপরাধকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে জানিয়ে শফিউল আলম বলেন, যাতে সাইবার ক্রাইম রোধ করা যায়। খসড়া আইনের সাইবার সন্ত্রাসের সংজ্ঞা উল্লেখ করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও সংহতিকে আঘাত করে এমন কোনো জিনিস, অন্য কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত বা এর সম্পদ ক্ষতি বা বিনষ্ট করে এমন কোনো বিষয়। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন কোনো কিছু করে, সহায়তা করে বা প্ররোচিত করে এগুলো। কোনো সশস্ত্র সংঘাতময় দ্বন্দ্বের বৈরী পরিস্থিতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেননি এমন কোনো বেসামরিক ব্যক্তি বা অন্য কোনো রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের কোনো কম্পিউটার, প্রোগ্রামিং ইত্যাদির নেটওয়ার্কে মারাত্মক ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে কোনো কিছু করা- এ সবকিছুই সাইবার সন্ত্রাস হিসেবে গণ্য হবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, কম্পিউটার, মোবাইল বা কোনো ডিজিটাল ডিভাইস-সংক্রান্ত জালিয়াতিতে শাস্তি সর্বোচ্চ ৫ ও সর্বনিম্ন এক বছরের কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কম্পিউটার ও মোবাইলে প্রতারণা এবং হুমকিতেও একই শাস্তির কথা বলা হয়েছে খসড়া আইনে। খসড়া আইনে ডিজিটাল মাধ্যমে ছদ্মবেশ ধারণে শাস্তির কথা উল্লেখ আছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতারণা ও ঠকানোর উদ্দেশ্যে অপর কোনো ব্যক্তির পরিচয় ধারণ করে বা অন্য কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য নিজের বলে দেখায় তাহলেও শাস্তি সর্বোচ্চ ৫ ও সর্বনিম্ন এক বছরের কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, কোনো ব্যক্তি অসৎ উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে অন্য কোনো ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া তার ব্যক্তিগত ছবি তুলে এবং প্রকাশ করে, প্রেরণ করে বা বিকৃত করে ধারণ করে তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এর শাস্তি হলো ২ বছরের কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, পর্নোগ্রাফির জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের ও কমপক্ষে ২ বছরের কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডের বিধান রয়েছে প্রস্তাবিত আইনে। শত্রুতা সৃষ্টি ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর মতো কোনো কাজ কেউ ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে করে তবে শাস্তি সর্বোচ্চ ৭ ও কমপক্ষে এক বছরের কারাদন্ড বা সাত লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধে সহায়তাকারীও মূল অপরাধীর সমান দন্ডে দন্ডিত হবেন জানিয়ে শফিউল আলম বলেন, ব্যক্তি অপরাধ করলে যে শাস্তি কোম্পানি অপরাধ করলেও সেই শাস্তি প্রযোজ্য হবে। নেটওয়ার্ক সেবাপ্রদানকারী যদি প্রমাণ করতে পারেন অপরাধ বা আইনের লঙ্ঘন তার অজ্ঞাতসারে হয়েছে, তাহলে খসড়া আইন অনুযায়ী তিনি শাস্তি পাবেন না। শাস্তিগুলো যাচাই-বাছাই করে আইনমন্ত্রীকে ঠিকঠাক করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, শাস্তি কোনোটা একটু বেশি করার প্রয়োজন আছে, কোনোটা কমানোর প্রয়োজন আছে- সেটা ওনারা দেখে দেবেন। ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্য প্রস্তাবিত আইনে ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সি গঠনের কথা বলা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এর প্রধান হবেন মহাপরিচালক। যদি জরুরি মনে করেন তবে মহাপরিচালক সরকারের কোনো আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে কম্পিউটারের মাধ্যমে কোনো তথ্য সম্প্রচারে বাধা দেয়ার নির্দেশ দিতে পারবেন। সম্ভাব্য আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে মহাপরিচালকের নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ দেয়ার ক্ষমতাও থাকবে। যদি তা কেউ না মানে তবে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হবে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইন, ২০১৬’ থাকার পরও কেন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি প্রণয়নের প্রয়োজন হলো- এমন প্রশ্নে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আইসিটি আইনের কয়েকটি ধারায় শাস্তির বিধান আছে, কিন্তু এগুলো অপর্যাপ্ত। এ বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বিস্তারিত আইন আছে এটার। সেটার আদলেই এটা করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম বলেন, আইসিটি আইনের যে বিধানগুলো আছে সেগুলো এখানে কাভার (অন্তর্ভুক্ত) করে ওই ধারাগুলোকে ওখান থেকে বাদ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা (এ ধারাটি বিতর্কিত) বাদ যাবে কিনাÑ জানতে চাইলে শফিউল আলম বলেন, ২০১৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৭-এ চারটি ধারা ওখান থেকে সরিয়ে এখানে (ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন) নতুন কয়েকটি ধারা প্রস্তাব করা হয়েছে। ওই ধারাগুলো এখানে স্থানান্তর হয়ে যাবে। ওই অপরাধের বিষয়গুলো এখানে চলে আসবে। যখন এখানে চলে আসবে তখন ওই ধারাগুলো ওখান থেকে বাদ হয়ে যাবে। আগের আইনের ওই ধারার মামলাগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মামলাগুলো আগের আইনেই চলবে। পুরনো আইনগুলোর আলোকে যে মামলা চলমান সেগুলো চলবে। নতুনভাবে হবে না। এদিকে দেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সংরক্ষিত ও প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের গাছ কাটার ওপর বিধিনিষেধের সময় ২০২২ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এ জন্য বৃদ্ধি-সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, দেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষার উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত ও প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের গাছ কাটার ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ ২০২৫ সাল পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ২০২২ সালের ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিধিনিষেধ আরোপের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। গত ২০১৫ সালের ৩১শে ডিসেম্বর সংরক্ষিত ও প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের গাছ কাটার ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের মেয়াদ শেষ হয়। শফিউল আলম জানান, গাছ কাটার ওপর নতুন বিধিনিষেধের সময় চলতি বছরের ১লা জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে। তা আগামী ৭ বছর অর্থাৎ ২০২২ সাল পর্যন্ত বহাল থাকবে।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

%d bloggers like this: