অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৮ই রমযান, ১৪৪০ হিজরী

মুদ্রানীতি ঘোষণা : নতুন ব্যাংক অনুমোদনে নমনীয় গভর্নর

Print

বিশেষ প্রতিবেদক : নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেওয়ার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বারবার নেতিবাচক মনোভাব দেখালেও মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় নমনীয় মনোভাব দেখালেন গভর্নর ফজলে কবির। তিনি বলেন, নতুন ব্যাংক দেওয়া যাবে না তা না। নতুন ব্যাংক দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোর্ড। এদিকে নতুন মুদ্রানীতিতে সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ অপরিবর্তিত রেখে বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ বজায় রাখতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে।
গতকাল দুপুরে মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে গভর্নর ফজলে কবির ২০১৭-১৮ অর্থবছরের (জানুয়ারি-জুন) দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, বেসরকারি খাতে অস্বাভাবিকভাবে ঋণের প্রবাহ বেড়ে যাওয়া, নির্বাচনের বছরে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাওয়া, আমদানির চাপ বেড়ে যাওয়াসহ বেশ কয়েকটি কারণে এ মুদ্রানীতি প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ফজলে কবির বলেন, অভ্যন্তরীণ ঋণ জোগানের বেসরকারি খাতের অংশের প্রবৃদ্ধি আগেকার ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ মাত্রার চেয়ে উচ্চতর ১৬ দশমিক ৮ শতাংশে (প্রক্ষেপিত) নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে নতুন মুদ্রানীতিতে সরকারি ঋণ প্রবাহের লক্ষ্যমাত্র আগের মতোই ১৫ দশমিক ৮ শতাংশে স্থির রাখা হয়েছে। সরকারি অর্থায়নে ব্যাংক ঋণের ব্যবহার কমে যাওয়ায় বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ বাড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে জানান গভর্নর।
চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতিতে চলতি ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ১৬ দশমিক ২ শতাংশ। আর আগামী জুন পর্যন্ত এই খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু নভেম্বরেই বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ১৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে অব্যাহতভাবে বাড়ছে ঋণ বিতরণ। বর্তমানে এই খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৯ শতাংশেরও বেশি। যা বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। একইভাবে চাল, পেঁয়াজসহ জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতির হারও বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, আগামী জুন পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি থাকার কথা ৫ দশমিক ৮ শতাংশের নিচে। কিন্তু এরই মধ্যে এই লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার অসহনীয় মাত্রায় রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ডিসেম্বর মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ; যা নভেম্বরে ছিল ৫ দশমিক ৮৩ ভাগ। এ মাসে খাদ্যে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ; যা নভেম্বরেও ছিল ৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি বছর ২ বার মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও প্রকাশ করে থাকে। একটি অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ জুলাই মাসে এবং অন্যটি জানুয়ারি মাসে। সাধারণত মুদ্রার গতিবিধি প্রক্ষেপণ করে এ মুদ্রানীতি। মুদ্রানীতির অন্যতম কাজগুলো হলোÑ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করা, ঋণের প্রক্ষেপণের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি ঋণের জোগান ধার্য করা এবং মুদ্রার প্রচলন নিয়ন্ত্রণ করা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বরাবরই নতুন ব্যাংক দেওয়ার বিরোধিতা করে আসছিল। কিন্তু গতকাল এবিষয়ে প্রশ্ন করা হলে গভর্নর বলেন, নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেওয়া হবে না বা দেওয়া যাবে না, তা না। সরকার যদি নতুন ব্যাংক চায় তাহলে বিষয়টি দেখবে বাংলাদেশ ব্যাংককের বোর্ড। মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক মতামত দিয়েছে। এনিয়ে আলোচনা হবে। আলোচনা করেই সিদ্ধন্ত নেওয়া হবে।
অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কালোটাকা রোধে যা করা দরকার তাই করবে। এজন্য ব্যাংক ও আর্থিক চ্যালেনগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হবে।
চুরি যাওয়া টাকার বিষয়ে গভর্নর বলেন, এরই মধ্যে একটা অংশ আমরা পেয়েছি। আরো সামান্য কিছু টাকা কিছুদিনের মধ্যে হাতে পাওয়া যাবে। এবিষয়ে আদালতের রায় পাওয়া গেছে। বাকি টাকা উদ্ধারে আইনি প্রক্রিয়া চলছে। গতকাল রাতে এবিষয়ে আলোচনার জন্য একটি দল যাচ্ছে। তারা চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন বলেও তিনি জানান।
গভর্নর তার মুদ্রানীতিতে বলেছেন, কর্পোরেট গ্রাহকদের মেয়াদি প্রকল্প বিনিয়োগ অর্থায়নে ব্যাংকগুলোর ওপর অতিনির্ভরতার প্রবণতা ক্রমান¦য়ে কমিয়ে এনে এদের মূলধন বাজারে বন্ড ইস্যু করে অর্থায়ন সংগ্রহে উৎসাহ ও সহায়তা প্রদানে ব্যাংকগুলোকে সক্রিয় করা। অনিবাসী বাংলাদেশিদের বৈদেশিক সঞ্চয় ও আর্থিক বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থ ও মূলধন বাজারমুখী করার জন্য এদের কাছে আকর্ষণীয় মুনাফাবাহী সরকারি ওয়েজ আর্নার্স বন্ডের বিক্রি প্রসারে এবং অনিবাসী বিনিয়োগ টাকা হিসাব (এআইটিএ) খুলে বাংলাদেশের মূলধন বাজারে এদের পোর্টফোলিও বিনিয়োগ পরিচালনায় ব্যাংকগুলোকে উদ্যোগী করা। ইন্টারনেটভিত্তিক ই-কমার্স প্লাটফর্মের মাধ্যমে বিদেশে পণ্য ও সেবা রপ্তানির আয় ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আনার প্রক্রিয়া সরলতর করা। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের আয়ের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আনার সুযোগ সুবিধাদি প্রসারের পাশাপাশি ওই বৈদেশিক মুদ্রার উৎস দেশেই হুন্ডি ব্যবসায়ীদের কুক্ষিগত করার কার্যক্রমে বাংলাদেশে মোবাইল ফোন একাউন্ট লেনদেনের যোগসাজশের অপতৎপরতা প্রতিরোধ ও দমনের জোরালো কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথাও বলেছেন।
তিনি বলেন, বিনিয়োগ ও উৎপাদন কর্মকাÐে প্রবৃদ্ধি গতিশীলতা বজায় রাখার স¦ার্থে অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে অভ্যন্তরীণ ঋণের জোগান প্রবৃদ্ধিতে সংকোচন না এনে আগেকার ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ মাত্রায় অপরিবর্তিত রাখা হবে, যা অনধিক ৬ দশমিক ০ শতাংশ মূল্যস্ফীতিতেও দেশজ উৎপাদনে প্রকৃত প্রবৃদ্ধির ৭ দশমিক ৪ শতাংশ সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য পর্যাপ্ত হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপো, রিভার্স রেপোনীতি সুদহারগুলোও এ পর্যায়ে পূর্ববর্তী ৬ দশমিক ৭৫ ও ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ ঋণ জোগানের বেসরকারি খাতের অংশের প্রবৃদ্ধি আগেকার ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ মাত্রার চেয়ে উচ্চতর ১৬ দশমিক ৮ শতাংশে প্রক্ষেপিত হয়েছে; সরকারি অর্থায়নে ব্যাংক ঋণের ব্যবহার কমে যাওয়ায় বেসরকারি খাতের জন্য এই বৃদ্ধির পরিসর এসেছে। আমদানির বৈদেশিক পরিশোধ দায় স্ফীতির সম্ভাব্য মাত্রায় হ্রাস ধরেও নিট বৈদেশিক সম্পদ (এনএফএ)-এর প্রবৃদ্ধি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের শেষে প্রায় শূন্যের কোঠায় (০ দশমিক ১ শতাংশে) দাঁড়াবে বলে প্রক্ষেপিত হয়েছে। সরকারের ব্যাংক ঋণ ব্যবহারে ঋণাত্মক ধারা রিজার্ভ মুদ্রার (আরএম) প্রবৃদ্ধি পরিমিত রেখে মূল্যস্ফীতি চাপ উপশমে সহায়তা দেবে, পাশাপাশি প্রায় শূন্যের কোঠার এনএফএ প্রবৃদ্ধি ব্যাপক মুদ্রার (এম২) প্রবৃদ্ধিকে পূর্ব প্রক্ষেপিত ১৩ দশমিক ৯ শতাংশের চেয়ে অনেকটা কম ১৩ দশমিক ৩ শতাংশে পরিমিত রাখবে।
ফজলে কবির বলেন, প্রবৃদ্ধি গতিশীলতার স্বার্থে অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধির সংকোচন এড়িয়েই মূল্যস্ফীতি চাপ ও বৈদেশিক লেনদেন খাতে স্থিতিশীলতার ওপর চাপ প্রশমন অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রা ও আর্থিকনীতি কার্যক্রমের উদ্দিষ্ট হবে। এই উদ্দিষ্ট অর্জনের জন্য প্রধাণত নির্ভর করবো ব্যাংকগুলোর ঋণ জোগান ও বৈদেশিক দায় সৃষ্টি স্ব স্ব প্রাতিষ্ঠানিক সংগতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মাত্রায় পরিমিত রাখার ওপর। এজন্য ব্যাংকগুলোর আগাম ও আমানতের অনুপাতের নির্দেশিত মাত্রার যৌক্তিকীকরণের পাশাপাশি সম্পদ-দায় ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাসহ প্রাসংগিক সব ম্যাক্রো প্রæডেন্সিয়াল নিয়মাচার শৃঙ্খলা পরিপালনের বাধ্যবাধকতা কঠোরতর করা হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সংগতির সাথে সামঞ্জস্যহীন উচ্চমাত্রায় ঋণ জোগান অঙ্গীকার বা বৈদেশিক পরিশোধ দায় সৃষ্টি আমানতকারীদের স্বার্থের এবং ব্যাপকতর জনস্বার্থের হানিকর বলে প্রতীয়মান হলে তাদের এ ধরনের দায়িত্বহীনতা রোধে ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিধানসমূহের কার্যকরী প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে। এ বিষয়ে কঠোরতা সজ্ঞান অভিসন্ধিপ্রসূত বা অবিবেচিত অতি উৎসাহ প্রসূত উভয় ধরনের দায়িত্বহীনতা নিরুৎসাহিত করবে, ব্যাংক ঋণের গুণগতমান বৃদ্ধি করবে এবং যোগ্য প্রকৃত উৎপাদনমুখী উদ্যোগগুলোর জন্য অর্থায়ন জোগান প্রশস্ত করে সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন অভীষ্টগুলো অর্জনের পথ সুগম করবে।
তিনি বলেন, ঋণ কার্যক্রম ও বৈদেশিক পরিশোধ দায় সৃষ্টিতে কঠোরতর শৃঙ্খলা আরোপের ব্যবস্থার পাশাপাশি দেশের অর্থ ও মূলধন বাজারগুলোয় স্থানীয় ও বৈদেশিক উৎসের তহবিল আকর্ষণের আরো কয়েকটি পদক্ষেপ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রা ও ঋণনীতি কার্যক্রমে হাতে নেয়া বা জোরদার করা হবে।
মুদ্রানীতি ঘোষণা : নতুন ব্যাংক অনুমোদনে নমনীয় গভর্নর
বিশেষ প্রতিবেদক : নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেওয়ার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বারবার নেতিবাচক মনোভাব দেখালেও মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় নমনীয় মনোভাব দেখালেন গভর্নর ফজলে কবির। তিনি বলেন, নতুন ব্যাংক দেওয়া যাবে না তা না। নতুন ব্যাংক দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোর্ড। এদিকে নতুন মুদ্রানীতিতে সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ অপরিবর্তিত রেখে বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ বজায় রাখতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে।
গতকাল দুপুরে মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে গভর্নর ফজলে কবির ২০১৭-১৮ অর্থবছরের (জানুয়ারি-জুন) দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, বেসরকারি খাতে অস্বাভাবিকভাবে ঋণের প্রবাহ বেড়ে যাওয়া, নির্বাচনের বছরে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাওয়া, আমদানির চাপ বেড়ে যাওয়াসহ বেশ কয়েকটি কারণে এ মুদ্রানীতি প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ফজলে কবির বলেন, অভ্যন্তরীণ ঋণ জোগানের বেসরকারি খাতের অংশের প্রবৃদ্ধি আগেকার ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ মাত্রার চেয়ে উচ্চতর ১৬ দশমিক ৮ শতাংশে (প্রক্ষেপিত) নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে নতুন মুদ্রানীতিতে সরকারি ঋণ প্রবাহের লক্ষ্যমাত্র আগের মতোই ১৫ দশমিক ৮ শতাংশে স্থির রাখা হয়েছে। সরকারি অর্থায়নে ব্যাংক ঋণের ব্যবহার কমে যাওয়ায় বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ বাড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে জানান গভর্নর।
চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতিতে চলতি ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ১৬ দশমিক ২ শতাংশ। আর আগামী জুন পর্যন্ত এই খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু নভেম্বরেই বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ১৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে অব্যাহতভাবে বাড়ছে ঋণ বিতরণ। বর্তমানে এই খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৯ শতাংশেরও বেশি। যা বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। একইভাবে চাল, পেঁয়াজসহ জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতির হারও বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, আগামী জুন পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি থাকার কথা ৫ দশমিক ৮ শতাংশের নিচে। কিন্তু এরই মধ্যে এই লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার অসহনীয় মাত্রায় রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ডিসেম্বর মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ; যা নভেম্বরে ছিল ৫ দশমিক ৮৩ ভাগ। এ মাসে খাদ্যে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ; যা নভেম্বরেও ছিল ৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি বছর ২ বার মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও প্রকাশ করে থাকে। একটি অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ জুলাই মাসে এবং অন্যটি জানুয়ারি মাসে। সাধারণত মুদ্রার গতিবিধি প্রক্ষেপণ করে এ মুদ্রানীতি। মুদ্রানীতির অন্যতম কাজগুলো হলোÑ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করা, ঋণের প্রক্ষেপণের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি ঋণের জোগান ধার্য করা এবং মুদ্রার প্রচলন নিয়ন্ত্রণ করা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বরাবরই নতুন ব্যাংক দেওয়ার বিরোধিতা করে আসছিল। কিন্তু গতকাল এবিষয়ে প্রশ্ন করা হলে গভর্নর বলেন, নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেওয়া হবে না বা দেওয়া যাবে না, তা না। সরকার যদি নতুন ব্যাংক চায় তাহলে বিষয়টি দেখবে বাংলাদেশ ব্যাংককের বোর্ড। মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক মতামত দিয়েছে। এনিয়ে আলোচনা হবে। আলোচনা করেই সিদ্ধন্ত নেওয়া হবে।
অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কালোটাকা রোধে যা করা দরকার তাই করবে। এজন্য ব্যাংক ও আর্থিক চ্যালেনগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হবে।
চুরি যাওয়া টাকার বিষয়ে গভর্নর বলেন, এরই মধ্যে একটা অংশ আমরা পেয়েছি। আরো সামান্য কিছু টাকা কিছুদিনের মধ্যে হাতে পাওয়া যাবে। এবিষয়ে আদালতের রায় পাওয়া গেছে। বাকি টাকা উদ্ধারে আইনি প্রক্রিয়া চলছে। গতকাল রাতে এবিষয়ে আলোচনার জন্য একটি দল যাচ্ছে। তারা চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন বলেও তিনি জানান।
গভর্নর তার মুদ্রানীতিতে বলেছেন, কর্পোরেট গ্রাহকদের মেয়াদি প্রকল্প বিনিয়োগ অর্থায়নে ব্যাংকগুলোর ওপর অতিনির্ভরতার প্রবণতা ক্রমান¦য়ে কমিয়ে এনে এদের মূলধন বাজারে বন্ড ইস্যু করে অর্থায়ন সংগ্রহে উৎসাহ ও সহায়তা প্রদানে ব্যাংকগুলোকে সক্রিয় করা। অনিবাসী বাংলাদেশিদের বৈদেশিক সঞ্চয় ও আর্থিক বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থ ও মূলধন বাজারমুখী করার জন্য এদের কাছে আকর্ষণীয় মুনাফাবাহী সরকারি ওয়েজ আর্নার্স বন্ডের বিক্রি প্রসারে এবং অনিবাসী বিনিয়োগ টাকা হিসাব (এআইটিএ) খুলে বাংলাদেশের মূলধন বাজারে এদের পোর্টফোলিও বিনিয়োগ পরিচালনায় ব্যাংকগুলোকে উদ্যোগী করা। ইন্টারনেটভিত্তিক ই-কমার্স প্লাটফর্মের মাধ্যমে বিদেশে পণ্য ও সেবা রপ্তানির আয় ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আনার প্রক্রিয়া সরলতর করা। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের আয়ের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আনার সুযোগ সুবিধাদি প্রসারের পাশাপাশি ওই বৈদেশিক মুদ্রার উৎস দেশেই হুন্ডি ব্যবসায়ীদের কুক্ষিগত করার কার্যক্রমে বাংলাদেশে মোবাইল ফোন একাউন্ট লেনদেনের যোগসাজশের অপতৎপরতা প্রতিরোধ ও দমনের জোরালো কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথাও বলেছেন।
তিনি বলেন, বিনিয়োগ ও উৎপাদন কর্মকাÐে প্রবৃদ্ধি গতিশীলতা বজায় রাখার স¦ার্থে অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে অভ্যন্তরীণ ঋণের জোগান প্রবৃদ্ধিতে সংকোচন না এনে আগেকার ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ মাত্রায় অপরিবর্তিত রাখা হবে, যা অনধিক ৬ দশমিক ০ শতাংশ মূল্যস্ফীতিতেও দেশজ উৎপাদনে প্রকৃত প্রবৃদ্ধির ৭ দশমিক ৪ শতাংশ সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য পর্যাপ্ত হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপো, রিভার্স রেপোনীতি সুদহারগুলোও এ পর্যায়ে পূর্ববর্তী ৬ দশমিক ৭৫ ও ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ ঋণ জোগানের বেসরকারি খাতের অংশের প্রবৃদ্ধি আগেকার ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ মাত্রার চেয়ে উচ্চতর ১৬ দশমিক ৮ শতাংশে প্রক্ষেপিত হয়েছে; সরকারি অর্থায়নে ব্যাংক ঋণের ব্যবহার কমে যাওয়ায় বেসরকারি খাতের জন্য এই বৃদ্ধির পরিসর এসেছে। আমদানির বৈদেশিক পরিশোধ দায় স্ফীতির সম্ভাব্য মাত্রায় হ্রাস ধরেও নিট বৈদেশিক সম্পদ (এনএফএ)-এর প্রবৃদ্ধি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের শেষে প্রায় শূন্যের কোঠায় (০ দশমিক ১ শতাংশে) দাঁড়াবে বলে প্রক্ষেপিত হয়েছে। সরকারের ব্যাংক ঋণ ব্যবহারে ঋণাত্মক ধারা রিজার্ভ মুদ্রার (আরএম) প্রবৃদ্ধি পরিমিত রেখে মূল্যস্ফীতি চাপ উপশমে সহায়তা দেবে, পাশাপাশি প্রায় শূন্যের কোঠার এনএফএ প্রবৃদ্ধি ব্যাপক মুদ্রার (এম২) প্রবৃদ্ধিকে পূর্ব প্রক্ষেপিত ১৩ দশমিক ৯ শতাংশের চেয়ে অনেকটা কম ১৩ দশমিক ৩ শতাংশে পরিমিত রাখবে।
ফজলে কবির বলেন, প্রবৃদ্ধি গতিশীলতার স্বার্থে অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধির সংকোচন এড়িয়েই মূল্যস্ফীতি চাপ ও বৈদেশিক লেনদেন খাতে স্থিতিশীলতার ওপর চাপ প্রশমন অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রা ও আর্থিকনীতি কার্যক্রমের উদ্দিষ্ট হবে। এই উদ্দিষ্ট অর্জনের জন্য প্রধাণত নির্ভর করবো ব্যাংকগুলোর ঋণ জোগান ও বৈদেশিক দায় সৃষ্টি স্ব স্ব প্রাতিষ্ঠানিক সংগতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মাত্রায় পরিমিত রাখার ওপর। এজন্য ব্যাংকগুলোর আগাম ও আমানতের অনুপাতের নির্দেশিত মাত্রার যৌক্তিকীকরণের পাশাপাশি সম্পদ-দায় ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাসহ প্রাসংগিক সব ম্যাক্রো প্রæডেন্সিয়াল নিয়মাচার শৃঙ্খলা পরিপালনের বাধ্যবাধকতা কঠোরতর করা হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সংগতির সাথে সামঞ্জস্যহীন উচ্চমাত্রায় ঋণ জোগান অঙ্গীকার বা বৈদেশিক পরিশোধ দায় সৃষ্টি আমানতকারীদের স্বার্থের এবং ব্যাপকতর জনস্বার্থের হানিকর বলে প্রতীয়মান হলে তাদের এ ধরনের দায়িত্বহীনতা রোধে ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিধানসমূহের কার্যকরী প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে। এ বিষয়ে কঠোরতা সজ্ঞান অভিসন্ধিপ্রসূত বা অবিবেচিত অতি উৎসাহ প্রসূত উভয় ধরনের দায়িত্বহীনতা নিরুৎসাহিত করবে, ব্যাংক ঋণের গুণগতমান বৃদ্ধি করবে এবং যোগ্য প্রকৃত উৎপাদনমুখী উদ্যোগগুলোর জন্য অর্থায়ন জোগান প্রশস্ত করে সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন অভীষ্টগুলো অর্জনের পথ সুগম করবে।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.