অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ১৩ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২০শে সফর, ১৪৪৩ হিজরী

মৃত ব্যক্তির শুক্রাণু থেকে যমজ শিশু

Print

অনলাইন ডেস্ক : পরিবারের নতুন সদস্য বায়ে, প্রয়াত প্রথমেশ পাটিল ডানে ক্যান্সারে মারা যাওয়া পুত্রের জমিয়ে রাখা শুক্র থেকেই ভারতের এক দম্পতি ফিরে পেয়েছেন ছেলেকে। তাদের এক আত্মীয়ার গর্ভে সেই শুক্রাণু থেকে তৈরি ভ্রæণ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে যমজ শিশু। একটি পুত্র, একটি কন্যা। পুনে শহরের ইঞ্জিনিয়ার প্রথমেশ পাটিল জার্মানিতে পড়াশোনা করতে যান। সেখানে অসুস্থ হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায় তার ক্যান্সার হয়েছে।
ভারতে ফিরে বছর তিনেক পর তিনি মারা যান। তার মা বলেন, চিকিৎসা শুরুর আগেই জার্মানির একটি স্পার্ম ব্যাঙ্কে জমিয়ে রাখা ছিল তার ছেলের শুক্রাণু। তা থেকেই ফিরে এসেছে প্রিয় পুত্র। ক্যান্সারের সঙ্গে বছর তিনেক লড়াই করার পর যখন ২৭ বছরের যুবক প্রথমেশ পাটিল মারা যান ২০১৬ সালে। তখন তার বাবা-মা-বোন ভেঙ্গে পড়েন। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়, প্রতিবেশী- সকলেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
জার্মানিতে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে ছেলেকে ভারতে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন প্রথমেশের মা, রাজশ্রী পাটিল। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ছেলে হারানোর পর আমরা তো বটেই, ওর বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় সকলেই খুব কষ্ট পেয়েছিল। ছেলের চেয়ে মেয়ে প্রায় নবছরের ছোট.. সে দাদার সঙ্গে ওই বছর তিনেক এতটাই অ্যাটাচড হয়ে গিয়েছিল যে ও মারা যাওয়ার পর ভীষণ অবসাদে ভুগছিল। যে বছর তিনেক ভারতে চিকিৎসা হয়েছে, এমন একটা দিনও যায় নি যে কোনো না কোনো বন্ধু ওর কাছে আসে নি। তবে আমি নিজে মনে করতাম ছেলে সামনেই আছে। ওর ঘরে শুধুই ওর ছবি রেখে দিয়েছি। সবসময়ে ছেলের একটা ছবি নিজের কাছেও রাখি। এমন কি কোনো কিছু খেলেও, সামনে থাকে প্রথমেশের ছবি। হঠাৎই একদিন মনে হয় ছেলের শুক্রাণু তো জমিয়ে রাখা আছে জার্মানিতে। সেটা দিয়েই তো কৃত্রিম প্রজননের সাহায্যে আমিই ফিরিয়ে আনতে পারি প্রথমেশকে, বলেন পেশায় স্কুল শিক্ষিকা রাজশ্রী পাটিল। জার্মানিতে ক্যান্সারের চিকিৎসা শুরু করার আগেই সেখানকার ডাক্তারেরা প্রথমেশের শুক্রাণু জমিয়ে রেখে দিয়েছিলেন পরিবারের অনুমতি নিয়েই। তা রাখা ছিল সিমেন ক্রায়োপ্রিজারভেশন পদ্ধতিতে, চলতি কথায় যাকে বলে স্পার্ম ব্যাঙ্ক। রাজশ্রী পাটিল বলেন, সেই শুক্রাণু দেশে এনে কৃত্রিমভাবে ভ্রæণ প্রজনন ঘটিয়ে তিনি নিজের গর্ভে প্রতিস্থাপন করাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসকরা তাতে সম্মতি দেন নি। তখনই তাঁর এক সম্পর্কিত বোন এগিয়ে আসেন। প্রথমেশের জমিয়ে রাখা শুক্রাণু থেকে ভ্রæণ তৈরি করে সেই আত্মীয়ার গর্ভে প্রতিস্থাপন করা হয়, যাকে আইভিএফ পদ্ধতি বলা হয়। সেই আত্মীয়ার গর্ভেই ১২ই ফেব্রæয়ারি জন্ম নিয়েছে যমজ শিশু।
যে চিকিৎসক এই গোটা প্রক্রিয়াটি চালিয়েছেন, সেই ডা. সুপ্রিয়া পুরাণিক বলেন, প্রথমে তো জার্মানি থেকে প্রথমেশের রেখে যাওয়া শুক্রাণুটা নিয়ে আসাই একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল- যদিও ঠিকমতো রাখলে কখনও শুক্রাণু নষ্ট হয় না। কিন্তু অনেক জটিল আইনি ব্যাপার এর মধ্যে জড়িত। প্রথমেশের মার গর্ভে ওই ভ্রæণ প্রতিস্থাপন সম্ভব হত না। তার যে আত্মীয়ার গর্ভধারণ করেছেন, তিনি প্রথমবারের চেষ্টাতেই যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, জানাচ্ছিলেন ডা. পুরাণিক।
এমনিতেই কোনো মৃত ব্যক্তির শুক্রাণু ব্যবহার করে সন্তানের জন্ম দেওয়া ভারতে খুবই কম হয়। বিদেশে হয় এরকম আকছার। তবে ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এরকম কোনো ঘটনা জানা নেই, যেখানে এক পুত্রহারা মা তার সন্তানের শুক্রাণু ব্যবহার করিয়ে বলতে গেলে ছেলের পুনর্জন্ম ঘটাতে চেয়েছেন, বলছিলেন ডা. সুপ্রিয়া পুরাণিক।
রাজশ্রী পাটিল বলেন, যমজ সন্তান ঘরে আসার পর থেকেই গোটা পাড়া, আত্মীয়-স্বজন তাদের বাড়িতে আনন্দ উৎসবে মেতেছে। ছেলের শুক্রাণু থেকে জন্ম হলেও সদ্যজাতদের তিনি নাতি-নাতনী বলতে নারাজ। এরা তো আমার ছেলে আর মেয়েই। তাই পুত্র শিশুটির নাম রেখেছি মৃত ছেলের নামেই – প্রথমেশ, আর কন্যা শিশুটির নাম পৃষা।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

%d bloggers like this: