অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ৯ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৭ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরী

লাশ হয়ে চুনারুঘাটে ফিরছেন আলাউদ্দিন

Print

অনলাইন ডেস্ক: উন্নত জীবনের সন্ধানে সিলেট ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দিয়েছিলেন ইমাম মাওলানা আলাউদ্দিন আখুঞ্জি (৫৫)। কিন্তু তার পরিবর্তে এখন দেশে ফিরছেন তিনি নিথর, নিস্তব্ধ ও বাক্সবন্দি হয়ে। পরিবারের সদস্যরা তার মৃতদেহ এ সপ্তাহেই গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছেন। অন্যদিকে সিলেটের তারা উদ্দিন (৬৪)-এর লাশ যুক্তরাষ্ট্রেই দাফন করা হবে। এ কথা জানিয়েছেন তার ভাই মাশুক উদ্দিন। শনিবার নিউ ইয়র্কের ওজোন পার্কে ইমাম আলাউদ্দিন ও তার সহযোগী তারা উদ্দিনকে গুলি করে হত্যার পর এখন মৃতদেহ দেশে পাঠানো হচ্ছে। তাকে হত্যার ফলে স্থানীয় মুসলিম সমাজ, বাংলাদেশিদের মধ্যে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। এ হত্যাকে ঠাÐা মাথায় খুন বলে আখ্যায়িত করেছেন সিটি কম্পট্রোলার স্কট স্ট্রিঙ্গার। এ ঘটনায় সন্দেহজনকভাবে একজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ গঠন করা হয়নি। সোমবার দিনের একেবারে শুরুর দিকে এনবিসি নিউজ সন্দেহজনক ব্যক্তিকে আটক ও জিজ্ঞাসাবাদের খবর দিয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তবে পুলিশের মুখপাত্র এ রিপোর্ট নিশ্চিত করেননি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ইমাম আলাউদ্দিন ও তারা উদ্দিনকে হত্যার পর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে সাংবাদিক মার্ক মোরালেস লিখেছেন, ৫৫ বছর বয়সী কুইন্সের ওজোন পার্কের এই ইমামকে সপ্তাহান্তে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ সময় সাত সন্তানের পিতা আলাউদ্দিন আখুঞ্জি ও তারা উদ্দিন ৭৯তম স্ট্রিট ও লিবার্টি এভিনিউ দিয়ে পায়চারি করছিলেন।
ইমাম আলাউদ্দিন উন্নত জীবনের আশায় বাংলাদেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দিয়েছিলেন। এখন তার মৃতদেহ দেশে পাঠানো হচ্ছে। তিনি যে আল ফুরকান জামে মসজিদে ইমামতি করতেন সেখানেই কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তারই আত্মার শান্তি কামনা করে মোনাজাত করা হয়েছে। তার ছেলে নাইম আখুঞ্জি (২১) শোকে ভেঙে পড়েছেন। তিনি বার বার ভেঙে পড়ে জানতে চাইছেন, আমরা ন্যায়বিচার চাই। কেন তারা আমার পিতাকে হত্যা করলো? এ প্রশ্নের উত্তরে আইনপ্রয়োগকারী কর্মকর্তারা বলেছেন, তিনি ও তার সহযোগী তারা উদ্দিন টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন। রোববার তাদের বাসস্থান ও ওজোন পার্ক এলাকায় গিয়ে ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করেছেন রাজনীতিকরা। প্রতিবেশী ও অধিকারবিষয়ক কর্মীরা মনে করছেন, ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে এই হত্যাকাÐ চালানো হয়েছে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা বলেছেন, উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে এখনও তদন্ত করতে উন্মুক্ত অবস্থায় রয়েছেন গোয়েন্দারা। তবে তাদেরকে বিদ্বেষমূলকভাবে হত্যার পক্ষে তারা কোনো তথ্য প্রমাণ পান নি।
ওদিকে ঘাতক তাদেরকে হত্যা করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা অস্ত্র হাতে একজনকে পালিয়ে যেতে দেখেছেন। নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট ওই ঘাতকের একটি স্কেচ প্রকাশ করেছে। তাতে তাকে দেখানো হয়েছে মুখে দাড়ি। চোখে চশমা। রোববার ওই মসজিদ ও আশেপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করছে নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট। রোববার বিকালে আল ফুরকান জামে মসজিদে এক সংবাদ সম্মেলন করেছেন নির্বাচিত কিছু কর্মকর্তা। তার মধ্যে সিটি কম্পট্রোলার স্কট স্ট্রিঙ্গার বলেছেন, এটা ছিল ঠাÐা মাথায় হত্যাকাÐ। রোববার পরের দিকে মেয়র বিল ডি বøাসিও একটি বিবৃতি দেন। তাতে তিনি বলেছেন, যখন ধর্মীয় নেতাদের টার্গেট করা হয়, তখন ওজোন পার্কের আমরা সবাই সেই বেদনা অনুভব করি। সেই বেদনা আমরাও বহন করি। উল্লেখ্য, মাত্র ৫ বছর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে সুন্নি মতাবলম্বী ইমাম আলাউদ্দিন কুইন্সে বাংলাদেশি সমাজের কাছে দ্রæততার সঙ্গে ভীষণ সম্মানের পাত্র হয়ে উঠেছিলেন। গেøনমোর এভিনিউতে অবস্থিত আল ফুরকান জামে মসজিদ। এখানে তিনি ঘন ঘন ধর্মীয় বক্তব্য রাখতেন। তাকে ও তারা উদ্দিনকে গুলি করে হত্যার কিছুক্ষণ আগে তিনি ওই মসজিদে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন। মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান উপদেষ্টা বদরুল খান বলেছেন, নামাজ আদায় করতে লোকজন সব সময়ই এই মসজিদে আসেন। কিন্তু ইমাম আলাউদ্দিনের কথা, বক্তব্য শোনার জন্য নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা আগেই মুসল্লিরা সমবেত হতেন মসজিদে। এছাড়া, তিনি ইমামতি করেছেন কুইন্সের ব্রোঙ্কস এবং ইস্ট এলমহার্স্টে। তাকে হত্যার খবরে রোববার বিকালে ওজোন পার্কে ওই মসজিদে সমবেত হন প্রায় ১০০ মুসলিম। তাদের অনেকের দাবি, এই দুজন ধর্মীয় নেতাকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তা বিদ্বেষমূলক। বদরুল খান বলেন, লোকজন মনে করে আমরা সন্ত্রাসী। কিন্তু আমরা তা নই। আমরা শান্তিপ্রিয় মানুষ। তিনি যখন মসজিদের সংবাদ সম্মেলন করছিলেন তখন অনেকেই সেøাগান দেন ‘আমরা সুবিচার চাই’। সেখানে সিটি কাউন্সিলের স্পিকার মেলিসা মার্ক-ভিভেরিতো বলেছেন, কাউকে তার ব্যাকগ্রাউন্ড, ধর্মীয় বিশ্বাস ও অন্য কোনো কারণে টার্গেট করা হবে এটা আমরা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করি। আমি জানি তদন্ত এখন প্রাথমিক পর্যায়ে। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, এই দুজন ব্যক্তিকে আমাদের রাজপথে হত্যা করা হয়েছে। এটা বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়। তিনি আরো বলেন, সিটি কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে যে, মুসলিম সম্প্রদায় নিরাপদ। নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে যে সম্পর্ক বিদ্যমান তা অব্যাহত থাকা উচিত। উল্লেখ্য, এই সম্পর্ক অনেক সময়েই টান পড়ে। ২০১১ সালে বার্তা সংস্থা রিপোর্ট করে যে, গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা নিউ ইয়র্ক, নিউ জার্সিতে ছাত্রদের গ্রæপের ভেতরে ও মসজিদে প্রবেশ করে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা। এ নিয়ে সমালোচনা ওঠে। তখন মানবাধিকার বিষয়ক গ্রæপগুলো নিউ ইয়র্ক পুলিশ বিভাগের বিরুদ্ধে মামলা করে। সেই টানাপড়েন এ বছরের শুরুর দিকে অনেকটাই মিটে গেছে।
আইনপ্রয়োগকারী কর্মকর্তারা বলছেন, সার্ভিলেন্স ভিডিওতে দেখা যায়, অস্ত্রধারী ঘাতক অপেক্ষা করছে ওই ইমাম ও তার সহযোগীর জন্য। তারপর কিছুটা দূর থেকে সে তাদেরকে অনুসরণ করতে থাকে। এরপর দ্রæত তাদের কাছে গিয়ে পেছন থেকে মাথায় গুলি করে। এ সময় আলাউদ্দিন আখুঞ্জির পকেটে ছিল এক হাজার ডলার। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, ঘাতককে অস্ত্র হাতে হেঁটে যেতে দেখা গেছে। আলাউদ্দিন আখুঞ্জির নিকট আত্মীয় মমিন আহমেদ (৩৭) বলেছেন, গোয়েন্দারা তাকে একটি গাড়ির ছবি দেখিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ঘাতক এতে চলে গেছে। তিনি বলেন, আমি আশা করবো আইনপ্রয়োগকারীরা তাকে ধরতে পারবে। কারণ, আলাউদ্দিন আখুঞ্জির কোনো শত্রæ ছিল না। তিনি সন্তানদের উন্নত জীবনের আশায় যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। তিনি সন্তানদের ইংরেজি শিক্ষা দিয়ে শিক্ষিত করতে চেয়েছিলেন। মমিন আহমেদ বলেন, পরিবার তার মৃতদেহ এখন এ সপ্তাহেই বাংলাদেশে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে নিহত তারা উদ্দিনকে যুক্তরাষ্ট্রেই দাফন করা হবে বলে জানিয়েছেন তার ভাই মাশুক উদ্দিন। তিনি বলেছেন, আমার ভাই ধর্মপ্রাণ ছিলেন। সৎ ছিলেন। তিনি মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পছন্দ করতেন, যদিও তিনি খুব সামান্য ইংরেজি জানতেন। মাশুক উদ্দিন আশা করেন, ইমাম আলাউদ্দিন ও তার ভাইয়ের খুনি আটক হবে। আইনপ্রয়োগকারীরা তার সন্ধানে নেমেছে। তাকে আটক করে তারা জানতে চাইবেন, কেন সে এ হত্যাকাÐ ঘটিয়েছে।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

%d bloggers like this: