অনলাইন নিউজপেপার সাইট ঢাকা, ২রা কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১০ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরী

সিআরসিপি প্রযুক্তি: মহাসড়ক নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বিকল্প ব্যবস্থা

Print

স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশ একটি বৃষ্টিবহুল (বছরের প্রায় ৫-৬ মাস স্থায়ী) এবং গ্রীষ্মপ্রধান দেশ। আমরা জানি, বিটুমিন পানি এবং উষ্ণতার প্রতি খুবই সংবেদনশীল, তাই বিটুমিনাস পেভমেন্ট বা ফ্লেক্সিবল পেভমেন্ট ক্রমাগত ভারী বর্ষণ এবং অধিক তাপমাত্রায় দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে, বাংলাদেশের জলবায়ু বিবেচনায় কংক্রিট পেভমেন্ট বা রিজিড পেভমেন্ট একটি টেকসই বিকল্প ব্যবস্থা হতে পারে। এছাড়া, ওভারলোড, ব্রেকিং লোড, স্ট্যাটিক ও মন্থর গতিতে চলমান ভারী যানবাহনের লোড-এর ক্ষেত্রে ফ্লেক্সিবল পেভমেন্ট যেখানে খুবই নাজুক, এর বিপরীতে কংক্রিট পেভমেন্ট অপেক্ষাকৃত অধিকতর সহনশীল। ফ্লেক্সিবল পেভমেন্টের স্থায়ীত্ব সাধারণত ১০ বছর সেখানে রিজিড পেভমেন্টের স্থায়ীত্ব ২০-২৫ বছর। পেভমেন্টের জীবনকাল বিবেচনায় ফ্লেক্সিবল পেভমেন্টের ক্ষেত্রে ৫-১০ বছর অন্তর অন্তর ওভারলে অথবা পুনর্বাসন বা পুনঃনির্মাণের মাধ্যমে রিজিড পেভমেন্টের সমপর্যায়ে উন্নীত করতে বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়, পক্ষান্তরে রিজিড পেভমেন্টে মেরামত ব্যয় যৎসামান্য। সেকারণে, প্রাথমিকভাবে কংক্রিট পেভমেন্টের ব্যয় কিছুটা বেশি হলেও লাইফ সাইকেল ব্যয় বিবেচনায় এটি অনেক সাশ্রয়ী।
সিআরসিপি প্রযুক্তি শীর্ষক সেমিনারে এসব তথ্য উপস্থাপনা করা হয়। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক ড, শামসুল হক, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট, বুয়েট।
প্রধান অতিথি ছিলেন মোঃ আবদুস সবুর, প্রধান প্রকৌশলী, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, মডারেটর ছিলেন ড, মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এ কে এম মনির হোসেন পাঠান, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর
এবং সভাপতি, সড়ক ও জনপথ প্রকৌশলী সমিতি। স্বাগত বক্তব্য রাখেন, অমিত কুমার চক্রবর্তী, নির্বাহী প্রকৌশলী, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর
এবং সাধারণ সম্পাদক, সড়ক ও জনপথ প্রকৌশলী সমিতি। গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রধান প্রকৌশলী কনফারেন্স রুম, সড়ক ভবন, তেজগাঁওয়ে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, কংক্রিট পেভমেন্ট সাধারণত তিন ধরণের হয়ে থাকে ১) রেইনফোর্সমেন্ট ছাড়া জয়েন্টেড কংক্রিট পেভমেন্ট (জেপিসিপি) ২) রেইনফোর্সমেন্টসহ জয়েন্টেড কংক্রিট পেভমেন্ট (জেআরসিপি) ২) জয়েন্টবিহীন রেইনফোর্সমেন্টসহ কংক্রিট পেভমেন্ট যা কন্টিনিউয়াসলি রেইনফোর্সড কংক্রিট পেভমেন্ট (সিআরসিপি) নামে পরিচিত।
বাংলাদেশের হাইওয়ে নেটওয়ার্কের বিভিন্ন বাজার, নিচু এলাকা এবং টোলপ্লাজা গুলোতে ইতিমধ্যে জেআরসিপি ধরণের কংক্রিট পেভমেন্ট নির্মাণ করা হয়েছে এবং সেগুলো বহুবছর যাবত সগৌরবে টিকে আছে। উদাহরণ হিসেবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক (এন-১), ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক (এন-৩), সিলেট-তামাবিল-জাফলং মহাসড়ক, জামালপুর-শেরপুর-বনগাঁও সড়ক, চট্টগ্রাম পোর্ট এক্সেস রোড, শেরপুর-শ্রীবর্দি-বকশিগঞ্জ ইত্যাদি সড়কের বাজার এবং বিভিন্ন নাজুক অংশ; পাকশি ব্রিজ, মেঘনা ব্রিজ, শাহ আমানত ব্রিজ এবং ভৈরব ব্রিজ টোল প্লাজা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এর প্রেক্ষিতে বর্তমানে সওজ কর্তৃক বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ ও নাজুক অংশ যেমন বাজার, টোল প্লাজা, বন্দর এবং ভারী যানবাহন প্রবন (যেমন পাথর/বালুবাহী ট্রাক) অংশে চিরায়ত পদ্ধতিতে জেআরসিপি নির্মাণ কার্যক্রম চলমান আছে।

জেআরসিপি কংক্রিট পেভমেন্ট এবং সিআরসিপি-এর মধ্য প্রধান পার্থক্য হচ্ছেঃ
১) জেআরসিপি পেভমেন্ট এ ঘন ঘন জয়েন্ট থাকায় এতে কোন সরু ফাটল সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা থাকে না, অপরপক্ষে সিআরসিপি কিছুদূর পর পর সরু ফাটল সৃষ্টি হবে বিবেচনা করেই ডিজাইন করা হয়ে থাকে।
২) জেআরসিপি তে আড়াআড়ি এবং লম্বালম্বি দুই ধরণের জয়েন্ট থাকে কিন্তু সিআরসিপি তে লম্বালম্বি জয়েন্ট থাকলেও কন্সট্রাকশন জয়েন্ট ব্যতিত কোন আড়াআড়ি জয়েন্ট থাকে না।
৩) সিআরসিপি তে জেআরসিপি-এর তুলনায় অধিকতর রেইনফোর্সমেন্ট বা স্টীলরড ব্যবহারের কারণে এর নির্মাণ ব্যয় কিছুটা বেশী।
প্রথম কন্টিনিউয়াসলি রেইনফোর্সড কংক্রিট পেভমেন্ট তথা সিআরসিপি নির্মিত হয়েছিল ১৯২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের আরলিংটনের কাছাকাছি কলাম্বিয়া পাইক নামের স্থানে । আধুনিক ও বড় পরিসরে সিআরসিপি নির্মাণ মূলত জনপ্রিয়তা পায় ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝির সময় থেকে যখন এটি নির্মাণে স্লিপ-ফর্ম পেভার ব্যবহার শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩০ টি অঙ্গরাজ্য, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানী, জাপান, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ আফ্রিকা ইত্যাদি দেশে বহুবছর যাবত কন্টিনিউয়াসলি রেইনফোর্সড কংক্রিট পেভমেন্ট নির্মিত হচ্ছে। তাই, ভারী ট্রাফিক লোডিং এবং চ্যালেঞ্জিং পরিবেশগত অবস্থানে মহাসড়ক নির্মানে, শতবর্ষী সিআরসিপি প্রযুক্তির প্রয়োগ একটি পরীক্ষিত টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি যথা স্লিপ-ফর্ম পেভারের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথম সিআরসিপি এবং জেআরসিপি উভয় ধরণের কংক্রিট পেভমেন্ট সাসেক সড়ক সংযোগ প্রকল্প – ২ এর আওতায় নির্মাণ করা হচ্ছে। পেভারের মাধ্যমে পেভমেন্ট নির্মিত হওয়ায় কাজের মান নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি এর উপরদিয়ে চলমান যানবাহনে ভ্রমণ আরামদায়ক হচ্ছে। জেআরসিপি পেভমেন্ট এ জয়েন্ট থাকায় এর উপরদিয়ে চলাচলে কিছুটা ঝাঁকুনি বোধ করলেও সিআরসিপি এর ক্ষেত্রে চলাচল ঝাঁকুনিবিহীন হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মাননীয় অর্থমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে একনেক সভাসহ বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশের আবহাওয়া বিবেচনায় নিয়ে কনক্রিট পেভমেন্ট নির্মাণের নির্দেশনা প্রদান করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সাসেক-২ প্রকল্পের আওতায় কনক্রিট পেভমেন্ট নির্মণে করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মাননীয় অর্থমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়িত হচ্ছে। যার ফলে, টেকসই অবকাঠামো বিনির্মাণের এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা (লক্ষ্যমাত্রা-৯.১) অর্জনে বাংলাদেশ আরো একধাপ এগিয়ে যাবে বলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর মনে করে।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

%d bloggers like this: